ছোটবেলায় কবিতা পড়তাম,
“অনেক কথার গুঞ্জন শুনি,
অনেক গানের সুর,
সবচেয়ে ভালো লাগে যে আমার
মাগো ডাক সুমধুর।”
মা ডাক সত্যিই সুমধুর,সবার জন্যেই।
মা,ছোট্ট একটা শব্দ।কিন্তু এর পরিধি ব্যাপক এবং অপরিসীম। মা-তো মা-ই। তার কোন রূপ নেই।কারো সাথে তার কোন তুলনা নেই।মা হলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। সেই সম্পদের কি সদ্ব্যবহার করতে পেরেছি? “মা” সর্বক্ষেত্রে, সব পরিবেশেই মা। মা হলেন সঙ্গী এবং বন্ধু।যে গৃহে মা নেই,শীতল হাতের স্পর্শ সে গৃহে নেই।এটা সত্যি।
মাঝে মাঝে আমার হাতে ব্যথা করতো। আম্মাকে যদি বলতাম আমার এই হাতে খুব ব্যথা করে,আম্মা তখনি গিয়ে সরিষার তেল নিয়ে আসতেন এবং আমার হাতে মালিশ করে দিতেন।অনেক আরাম হতো। আসলে তো তেল কিছুই না।আসল তো হলো মায়ের হাতের স্নেহের পরশ।সেই পরশ থেকে আজ আমরা বঞ্চিত। আজ আম্মার কথা খুব মনে পড়ছে।অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে মাকে নিয়ে। কিন্তু মায়ের কথা কি লিখে শেষ করা যাবে? অজস্র স্মৃতি আম্মাকে নিয়ে,এসব তো সারাজীবন লিখেও শেষ করা যাবেনা।
ছোটবেলা,কিশোরবেলা ও বড় হওয়ার পরেও কত স্মৃতি আছে মায়ের সাথে।
আম্মা ছিলেন প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষিকা। আমাদের গ্রামেরই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন তিনি।আমরাও সেই স্কুলে পড়তাম।প্রতিদিন উনার সাথে স্কুলে যেতাম আবার তাঁর সাথেই বাড়ি ফিরতাম। খুব ভালো লাগতো এজন্যে যে সারাদিন আমাদের আম্মার সাথেই থাকা হতো।
প্রতিদিন সকালে মায়ের তেলাওয়াত শুনে শুনে ঘুম ভাঙ্গতো।আম্মা তেলাওয়াত করতেন খুবই মধুর কন্ঠে।সবাই তাঁর তেলাওয়াতের প্রশংসা করতেন।আমরা সবাই উনার কাছেই প্রাথমিক আরবি শিক্ষা গ্রহণ করি।বাংলা পড়ার হাতেখড়িও আম্মার কাছে। আমাদের মা ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক। কোনদিন কোন ফেরিওয়ালার সামনে তিনি বের হন নি।ছিলেন উদার মনের।অমায়িক ছিল তাঁ্র ব্যবহার। ছিলেন মিতভাষী। অনেক জ্ঞান ছিলো আমাদের মায়ের।ছিল এক সেবামূলক মন। নিম্নশ্রেণীর মানুষ থেকে আরম্ভ করে পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন সবার সেবা করে গেছেন। কোনদিন তার প্রতিদান চান নি।মা ছিলেন একটু রাশভারী।কোনদিন অপ্রাসঙ্গিক কোন কথাবার্তা বলতেন না।সবসময় উপদেশমূলক কথা বলতেন,ছিলেন পরামর্শদাত্রী, কর্মঠ এবং ধৈর্য্যশীল
এখনও চোখে ভাসে মা’র সেই স্কুলে যাওয়ার সময়কার কথা। মা সবসময় সাদা অথবা হালকা রঙের তাঁতের শাড়ি পরতেন।আম্মাকে কেমন যেন বেগম রোকেয়ার মতো লাগতো।
আম্মা আমাদের কোন কষ্ট হতে দেন নি। আম্মার সেই অবদান কি আমরা শোধ করতে পেরেছি? মায়ের জন্যে সবসময় দোয়া করি আল্লাহ তায়ালা যাতে তাঁকে জান্নাতবাসী করেন। (আমীন)
আজ মনে অনেক কষ্ট হয়। কিন্তু তোমাকে বলার সাধ্য নেই,আম্মা।কারণ তুমি তো এখন ঐ আকাশের তারা হয়ে গেছো।সবার দৃষ্টির আড়ালে,নাগালের বাইরে।অনেক চেষ্টা করেও তোমাকে পাবো না।মনের মাঝে অনেক কষ্ট। সেই কষ্টের কথা বলার মানুষ এখন আর নেই। তুমি সবকিছুর ঊর্ধ্বে চলে গেছ।মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা করে তোমাকে জড়িয়ে ধরি,চিৎকার করে “মা” বলে ডাকি।
সবসময়ই একটাই উপদেশ দিতে,ধৈর্য্য ধরতে, মুখ বন্ধ রাখতে।তোমার উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করছি আম্মা।
হঠাৎই আম্মার স্ট্রোক করলো। সবকিছু উলোটপালোট করে দিলো। আম্মা হয়ে গেলেন অন্যের বোঝা। কারণ আস্তে আস্তে নিজে নিজে চলাফেরা করতে পারতেন না।নিজ হাতে খেতে পারতেন না।যে হাত দিয়ে আস্ত গরু রান্না করতে পারতেন,যার রান্নায় সবাই পঞ্চমুখ থাকতো, যে হাত দিয়ে সারাজীবন অন্যের সেবা করেছেন,শেষ সময়ে এসে অন্যের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকতেন।বাচ্চাদের মতো হয়ে গিয়েছিলেন শেষের দিনগুলোতে।নাতি-নাতনীরা আম্মাকে নিয়ে ফূর্তি করতো, আর উনি ওদের কথায় হাসতে হাসতে শেষ। নাতি-নাতনীদের প্রতি ছিলো অগাধ স্নেহ,মমতা আর ভালবাসা।যখন সুস্থ ছিলেন,তখন ওদের জন্যে কতকিছু রান্না করতেন।
শেষদিকে আম্মার অনেক কষ্ট হয়েছে।আম্মাকে এভাবে দেখে আমি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতাম আর কাঁদতাম।আস্তে আস্তে উনার কথা বলা বন্ধ হয়ে গেলো। সব বন্ধন ছিন্ন করে,পৃথিবীর মায়া ছেড়ে আম্মা ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট না ফেরার দেশে চলে গেলেন।আম্মার সাথে যদি কোন খারাপ ব্যবহার করে থাকি কখনো, খোদা যেন আমাকে মাফ করে দেন।আমার আম্মাকে যেন তুমি খুবই আরামে রাখেন।
আমার একটা প্রিয় কবিতা দিয়ে শেষ করবো।
“মা যেন সূর্যাস্তের অলংকার, আয়াতভরা রক্ষাকবচ।
মা যেন মায়া,দূর্বলচিত্ততা।
মা যেন দেবদারুর ঘন নিশ্চুপ নিশ্চিন্ত পাখার নীড়।
মা যেন ব্যর্থতার ঝরাফুল,গভীর কোন গোপন বেদনা।
মা যেন টিনের চালের শ্রাবণের গান।
মা জ্ঞান,প্রশ্রয়, পরাজয়,
মা বরফগলা নদী,বিশ্রামের আয়োজন।
মা যেন খালি গায়ের গামছা,
মা যেন মেঘে ঢাকা ইতস্তত লুকোচুরি ক্ষীণ চন্দ্রালোকে।”
মা তুমি ধন্য,ধন্য,ধন্য।
By: Dr Nazmun Naher Khan