ছোটবেলা থেকে আমি হোঁচট খাওয়া পাবলিক। হোঁচট আর আছাড় খাওয়া আমার জন্যে অনেকটাই ডালভাত যেন। কেমন যেন একটা গোছালো হয়েও আত্মভোলা অগোছালো মানুষ।
জীবনের স্তরে স্তরে, প্রতিটি পদক্ষেপে একটা একটা হোঁচট।
না না,আমি কোন হতাশার গল্প শুনিয়ে বিরক্তির উদ্রেক করার জন্যে বলছিনা কথাগুলো।
আসলে গতকাল বারান্দায় ধপাস করে পড়ে গিয়ে কথাটা মাথায় আসলো।
*১৯৯৫ সাল। বাবা হজে গিয়েছিলেন সেই বার।মোবাইলবিহীন সেই যুগে কোন যোগাযোগ ছিলো না প্রায় ১ মাস। এই অবস্থায় একদিন রিহার্সালে যাওয়ার সময় সিঁড়িতে নেমেই দেখি বাবাকে। খুশিতে আবার বাসায় যেতে গিয়ে সিঁড়িতেই ধুপ। সে কি কান্না!!! কিছুক্ষণ পর শান্ত হয়ে তারপর রিহার্সালে যাওয়া।
*১৯৯৭ সাল। ক্লাস ফোর থেকে যখন ফাইভে উঠি,তখন অগ্রগামী স্কুলের তিনশোর্ধ ছাত্রীর মধ্যে মেধাতালিকায় তৃতীয় হই প্রথমবারের মতো। খুশিতে আত্মহারা আমি রিপোর্ট কার্ড নিয়ে দৌড় দেই মা-কে জানানোর জন্যে। তার আগেই ধপাস। আমার কান্না দেখে সবাই ভেবেছিলো ফেল করেছি।🙄🙄
*সেই থেকে শুরু আমার messy জীবন।
কখনো খেলতে গিয়ে,
কখনো সাইকেল চালাতে গিয়ে,
কখনো গাছে চড়তে গিয়ে…
আমাদের বন্দীজীবনের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতাম নানাবাড়ি গিয়ে…
আর সেখানেই এই সব অভিজ্ঞতা।
ফুপুবাড়িতে পুকুর ঘাটে বসে গল্পের বই পড়তাম,যদিও পানিতে নামার সাহস হয়নি কখনো। বৃষ্টির দিনে পিচ্ছিল মাটিতে পড়ার অভিজ্ঞতা যে কম না!!!
*হাঁটতে গিয়ে কিভাবে যে টেবিলের কর্নার, চেয়ারের পায়া, স্যান্ডেল কিংবা অন্যকিছু গায়েবি চলে আসে ধাক্কা দিতে,নিজেও জানিনা।😥😥😥
*একবার লাইব্রেরিতে বই কিনতে যাবো। রাজা ম্যানশনের সামনে ধপাস। এখন female দেখে কেউ ধরতেও পারছে না নিঃসংকোচে। পরে নিজেই কোনমতে উঠলাম।
*মেডিকেলের admission form আনতে গেলাম যেদিন,রিকশায় আমি,মা আর আমার ফ্রেন্ড একটা।
কখন যে রিকশা থেকে পড়ে গেলাম গোলুমোলু হয়ে,নিজেও জানিনা। 🙄🙄🙄
*ডাক্তারী জীবনে এসেও হাসপাতালের সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে নিজেই হেসে উঠেছিলাম জোরে জোরে। আমার এইসব সময়ে প্রচন্ড হাসি পায় কেন জানি!!!
*ইমোশনাল হোঁচট তো আর আছেই!!
২০১৪ সালের বিয়ে,২০১৫ সালের ডিভোর্স।
*তবে ২০১৮ এর সেই আছাড় খাওয়া আমাকে পাল্টে দেয় অনেকখানি।
একখানা মেজর লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া,
অপারেশন টেবিলের সেই তীব্র আলো, অপারেশন পরবর্তী অসহনীয় ব্যথা,recovery period এর struggle আমাকে বাঁচতে শেখায় নতুন করে।
*আমি অনেক গোছালো ধরনের অগোছালো মানুষ।অন্যমনস্ক টাইপের। হয়তো সেজন্যেই এতো হোঁচট খাওয়া।
জীবন আপাতদৃষ্টিতে অনেক সুন্দর, কিন্তু তারপরও চাঁদের কলঙ্কের মতো কিছু দাগ থাকে সব সুন্দরেই। থাকাটাই আসলে স্বাভাবিক। নাহলে জীবন জীবন থাকতো না হয়তো।
*তবে একটা বিষয় জানি। হোঁচট খেয়েও হাসতে জানি। নিজের সমালোচনা করতে জানি,সইতে জানি। সেটা থেকে শিক্ষা নিতে জানি।
কটু কথার বাণ,
তীব্র সমালোচনা,
সমাজের বক্রদৃষ্টি,
সুন্দর করে দেখতে থাকা স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়া,
টানেলের শেষ প্রান্ত ছুঁতে গিয়েও আবার শুরুর পয়েন্টে চলে আসা।
পিকচার পারফেক্ট পরিবারও সবসময় পিকচার পারফেক্ট থাকে না।
হয়তো বেঁচে থাকার এটাই আরেক নাম।
আমি মেকি নই,
অকপটে সত্য বলে দেওয়ার সাথে সাথে সত্য শুনতেও অভ্যস্ত।
নিজের অপরাধ কিংবা ভুল যা-ই করি,সেটা স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার সৎ সাহসটুকুও রাখি।
প্রতিটা হোঁচট আমাকে এখন জানান দেয়,জীবন পারফেক্ট হবে না কখনো। যেভাবে প্ল্যান করা হবে,তেমনটা smooth হবেনা।
তবুও messy একটা মানুষের স্বপ্ন দেখায় ছেদ পড়েনা।সে প্রতিটি হোঁচটের পরে আবার উঠে দাঁড়ায়। কাপড়ের ধূলো ঝেড়ে আকাশের দিকে তাকায়,কখনো আবার চোখ বন্ধ করে ফেলে। বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে বলে,আমরা কেউ-ই তো আপনার পরিকল্পনার ঊর্ধ্বে না।তাই যা হচ্ছে ভালোই হচ্ছে।যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। যা হবে ভালোই হবে। positive, negative সবকিছুই।
শুধু আশা একটাই।যাতে জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত হার না মানি,ভেঙ্গে না পড়ি।
হাসিমুখটা যেন হাস্যোজ্বল থাকে,সবসময়, শত হতাশার পরেও,প্রাপ্তির খাতায় অসংখ্য শূন্যের পরেও।
🙂🙂🙂🙂🙂
By: Dr Nazmun Naher Khan