প্রায়ই দেখবেন যখন আমাদের মন খারাপ থাকে বা কোন কারণে উদ্বিগ্ন থাকি বা একা থাকি আমরা কিছু বিশেষ খাবার খেতে পছন্দ করি। ক্ষুধা না থাকার পরও অনেক সময় খাই খাই ভাব থাকে।
এই বিশেষ খাবার গুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মিষ্টি / জাংক ফুড /আনহেলদি হয়ে থাকে। এরা আপনার পেটের ক্ষুধা নয় বরং মনের ক্ষুধা মেটায়।
ইমোশনাল ইটিং আপনার ইমোশনাল প্রবলেম/স্ট্রেস কমাতে পারে না, খাওয়ার সময়ে আপনার খুব ভালো লাগে কিন্তু পরে গিয়ে নিজেকে দোষী মনে হয় অতিরিক্ত খাওয়ার জন্য।
চলুন দেখে নেই ইমোশনাল ইটার কারা :
- যাদের স্ট্রেসড থাকলে খেতে ভালো লাগে।
- যারা ক্ষুধা না লাগলেও, পেট ভরা থাকলেও খায় এবং খাওয়ার কোন অজুহাত নিজেই তৈরি করে নেয়।
- মন খারাপ , দুশ্চিন্তা বা একাকীত্ব কাটাতে খায়
- নিজেকে ট্রিট দিতে খায়
- খাবার সামনে দেখলে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে না
নিজেকে ট্রিট দিতে নিজের পছন্দের খাবার খাওয়া টা খারাপ কিছু না তবে খাবার টা যখন আপনার ক্ষুধা নিবারণ পর্যন্ত সীমিত থাকছে না, আপনার আবেগ কে বশ করে ফেলছে এবং অতিরিক্ত আনহেলদি খাবার খেয়ে ফেলছেন তখন সমস্যা টা তৈরি হয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহন করার ফলে আপনার ওজন বেড়ে যায় এবং ইচ্ছাশক্তিও নষ্ট হয়ে যায়। ধীরে ধীরে খাবারের প্রতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকেন এবং ওজন বাড়তে বাড়তে একসময় ওবেসিটি সহ নানা রকম স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি হয়।
স্ট্রেসের সাথে আমাদের ওজন ও স্বাস্থ্য কিভাবে সম্পর্কিত :
স্ট্রেস আমাদের শারীরিক ও মানসিক উভয় স্বাস্থ্যকেই প্রভাবিত করে। আমাদের শরীর নানা ভাবেই স্ট্রেস কে সাড়া দেয় যার মধ্যে ওজন বৃদ্ধি পাওয়া একটি পদ্ধতি যা তাৎক্ষণিক দেখা না গেলেও ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। স্ট্রেসের প্রতিক্রিয়ায় আমাদের শরীর অতিরিক্ত কর্টিসোল হরমোন তৈরি করে। কর্টিসোল একটি স্ট্রেস হরমোন যা শরীরের এড্রেনাল গ্রন্থি থেকে নিঃসরণ হয়। কর্টিসোল হরমোন আবার ক্ষুধার হরমোন (ঘ্রেলিন) এর উদ্দীপক। তাই যখন কেউ স্ট্রেসড থাকে অতিরিক্ত কর্টিসোল হরমোন রিলিজর সাথে সাথে সেটা ক্ষুধার অনুভূতি ও বাড়িয়ে দেয়। আর এই ক্ষুধা নিবারণে শরীর হেলদি খাবারের পরিবর্তে খুঁজে কমফোর্ট ফুড। কমফোর্ট ফুড গুলো বেশিরভাগ সময়েই চিনি, মিষ্টি, জাংক ফুড হয়ে থাকে। মিষ্টি, রিফাইনড কার্ব, জাংক ফুড শরীরে দ্রুত হজম হয়ে যায় এবং দ্রুত শরীরকে এনার্জি দেয়া শুরু করে কিন্তু শরীর তখনই সেটা বার্ন করতে পারেনা। আবার এই খাবার গুলো ঘ্রেলিন হরমোনের উদ্দীপক। তাই আপনার ক্ষুধা ও বাড়তে থাকে।
উচ্চ মাত্রার কর্টিসোল হরমোন শুধু আপনার ক্ষুধা নয় মেটাবলিজম ও ইনসুলিন মাত্রা কেও প্রভাবিত করে।ইনসুলিন আপনার রক্তে সুগারের পরিমান নিয়ন্ত্রনের কাজ করে। কিন্তু যখন অতিরিক্ত সুগার বা কার্বোহাইড্রেট মানুষ গ্রহন করা শুরু করে ইনসুলিনের মাত্রাও বাড়তে থাকে। রক্তে সুগারের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে ইনসুলিন তখন তাকে আর নিয়ন্ত্রন করতে পারেনা এবং আপনার শরীর মেটাবলিক রিয়েকশনের মাধ্যমে সুগারকে ফ্যাট-এ রুপান্তর করে পরবর্তিতে ব্যবহারের জন্য। এই ইমোশনাল ইটিং সাইকেল চলতে থাকলে এই ফ্যাটের পরিমাণ বাড়তে থাকে সাথে ওজন ও।
স্ট্রেস যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তা পরবর্তীতে ডিপ্রেশন, উচ্চ রক্ত চাপ, হৃদরোগের ঝুঁকি সহ আরো অনেক সমস্যা হতে পারে।
বাপরে!! কি কঠিন কঠিন কথা।
শারীরিক ক্ষুধা ধীরে ধীরে অনুভূত হয়, ক্ষুধা লাগলে হেলদি খাবার তৈরি হওয়া পর্যন্ত ধৈয্য ধরবেন এবং তা পরিমাণ মতো খেয়ে পেট ভরবে ও তৃপ্তি মিটবে।
ইমোশনাল ক্ষুধা হঠাৎ ই অনুভব হয়, আপনার মনে হবে খুব ক্ষুধা পেয়েছে কিছু খেতেই হবে,জাংক ফুড / মিষ্টি জাতীয় খাবারের ক্রেভিং থাকে, আপনার পেট ভরছে কিনা সেটা আপনি খেয়াল করবেন না বরং আরো খেতে ইচ্ছা করবে যতক্ষন না মানসিক তৃপ্তি পাচ্ছেন, মনের ক্ষুধা গলা পর্যন্ত, যেটাকে বলে আহ! কব্জি ডুবিয়ে খেলাম, যেই খাবারের ক্রেভিং হয় সেটাই খেতে হয় অন্য কোন খাবার দিয়ে সেই ক্ষুধা মেটে না। যেমন ধরুন আপনার আইস ক্রিম খেতে ইচ্ছা করছে, আপনি যতো যাই খান না কেনো আইস ক্রিম না খাওয়া পর্যন্ত এই ক্ষুধা মিটবে না, খাওয়ার পর আপনার অতিরিক্ত খাওয়ার জন্য খারাপ লাগবে, নিজেকে দোষী মনে হবে, আক্ষেপ করবেন।
এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে যা করতে হবে :
প্রথমে খুঁজে বের করুন কোন কাজ গুলো থেকে স্ট্রেসড হন, তার একটা লিস্ট করুন এবং ধীরে ধীরে চেষ্টা করুন সেই লিস্ট থেকে একটা একটা কাজ বাদ দিতে।
একটা ফুড ডায়েরি তৈরি করুন, সেখানে দিনের কোন সময়ে কি খাচ্ছেন নোট করে রাখুন। ক্রেভিং এর সময়ে কি কি খাচ্ছেন তার একটা লিস্ট করুন, এবং সেই খাবার গুলো সরিয়ে ফেলুন বা বাসায় আনা বন্ধ করে দিন।
খাবার টেবিলে / ফ্রিজের উপর মোটিভেশনাল কোটেশন / স্টিকার লাগাতে পারেন।
লক্ষ্য করুন দিনের কোন সময় টা তে ক্রেভিং বেশি হয়, সেই সময় টা তে কোন এক্টিভিটি সেট করুন। সেটা হতে পারে নিজের পছন্দের গানের সাথে নাচ, হালকা হাঁটা, কফির সাথে বই পড়া ইত্যাদি।
যখন আপনার মনে হবে আপনি অনেকটাই স্ট্রেস ইটিং কমিয়ে ফেলেছেন তখন হেলদি ডায়েট ও লাইফস্টাইল আয়ত্তে আনার চেষ্টা করুন।
ডায়েট : হেলদি ব্যালান্সড ডায়েট নিশ্চিত করুন যেটা তে সব নিউট্রিয়েন্ট পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে শাক সব্জি, প্রোটিন ক্ষুধা কমাতে ও পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল আপনার ব্রেইন হেলথ ও নার্ভাস সিস্টেম কে উন্নত করে যা ক্লান্তি, অবসাদ, বিষণ্ণতা কমায়।
পানি: পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন ।পানি পেট ভরা অনুভূতি দেয়। শরীরের বিভিন্ন ফাংশনে সাহায্য করার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে, নেগেটিভ মুড, চাপ, বিষন্নতা কমাতে সাহায্য করে।
শরীরচর্চা: এক্সারসাইজ শুধু ওজন কমানোর জন্য নয় বরং সুস্থ থাকতে নিয়মিত শরীর চর্চার অভ্যাস করুন।
ঘুম : দৈনিক ৭-৮ ঘন্টা ঘুম নিশ্চিত করুন । এবং সেটা যেনো রাতেই হয়। রাতে ঘুম না হলে সার্কাডিয়ান রিদমে ব্যাঘাত ঘটে এবং সেই সময়ে ঘ্রেলিন হরমোন নিঃসরণ হয় বেশি যার ফলে ক্ষুধা লাগে এবং মিষ্টি / জাংক ফুডের ক্রেভিং থাকে কেননা সেটা তাৎক্ষণিক এনার্জি দেয়।
রিলাক্সেশন : প্রতিদিন নিজেকে সময় দিন অন্তত ৩০ মিনিট।সব ধরণের কাজ / দায়িত্ব থেকে সরে সেই সময় টা নিজের পছন্দের কাজ করুন বা বিশ্রাম নিন। ডিপ ব্রেথিং স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে, প্রতিদিন ৫-১০ মিনিট ডিপ ব্রেথিং অনুশীলন করুন।
বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সদস্যদের সাথে গল্প করুন, সময় দিন, ঘুরতে যেতে পারেন। আপনার সমস্যা নিয়ে কাছের মানুষদের সাথে খোলামেলা আলাপ করুন। সব বিষয়ে না বলবেন না বা নেগেটিভিটি খুঁজবেন না। এমনকি যারা আপনার ভালো কাজে নিরুৎসাহিত করে তাদের থেকে দূরে থাকুন। এভাবেই ধীরে ধীরে আপনি স্ট্রেস ইটিং থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারেন। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।
Written by Nasren Nipa