বাচ্চা লালন-পালন সংক্রান্ত একটা গ্রুপে টুকটাক লেখালেখির কারনে আমাকে অনেক মেয়েরা বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চেয়ে মেসেজ দেয়। তবে কয়েকদিন আগে আমি দুইটি মেসেজ পেয়েছি যা পেয়ে খুব মন খারাপ হয়েছে। সেই মেসেজ দুইটি আর আমার নিজের দেখা একটি ঘটনাসহ তিনটি গল্প বলি আগেঃ
১। হাসব্যান্ড এবং ওয়াইফ দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছে এবং প্রথম শ্রেনির সরকারি চাকরি করতেন। মেয়েটির পোস্টিং শ্বশুরবাড়ির পাশে এবং সে শ্বশুর-শাশুড়ি, ভাসুর-জ্বায়ের সাথে থাকে৷ তাদের প্রথম বাচ্চা জন্মানোর সাথে সাথে শাশুড়ি বাচ্চার মুখে মধু দিলেন বাচ্চার মায়ের শত নিষেধ, অনুরোধ স্বত্বেও। মধু এক বছরের আগে একটা বাচ্চার জন্য মোটেও ভালো কিছু নয়। যাই হোক, মেয়েটা হজম করলো, এবার বাড়ি ফিরে শুরু হলো মাথা, নাক, কান গরম সেক দিয়ে টিপে গোল করার যুদ্ধ। বাচ্চার মায়ের ‘না’ কে কানেও তোলে নাই! মেয়েটা মাতৃত্বকালীন ছুটির বেশিরভাগটাই বাবার বাড়িতে কাটানোয় কিছু রক্ষা পেলো।
৬ মাস ছুটি শেষে চাকরিতে জয়েন করতে শশুড়বাড়ি যেতে হলো। বাচ্চাকে বাসায় রেখে অফিসে যায়, বাচ্চাটি সারাদিন বাচ্চার দাদী আর চাচীর সাথে থাকে। অফিস শেষে বাড়ি ফেরার পর মাকে দেখলে বাচ্চা মহাখুশি। কিন্তু বাচ্চার যখন দুই বছর বয়স বাচ্চাটি হঠাৎ তার মাকে বলছে ‘মা পঁচা’। এই ছোট্ট দুটি শব্দ বাচ্চার মাকে ভীষন আতঙ্কে ফেলে দিলো! এতোটুকুন বাচ্চা মাকে পঁচা বলছে এমনকি মায়ের কোলে আসতে চায়না, মায়ের কাছে খেতে চায়না। এরই মধ্যে বাচ্চার মা নিজ কানে একদিন শুনতে পেলো শাশুড়ি বলছেন ‘ তোর মা পঁচা, তোকে রেখে অফিসে চলে যায়, তোকে ভালোবাসেনা’। পরে বাচ্চার জন্য রাখা কাজের মেয়ের কাছে জানতে পারেন যে তার শাশুড়ি আর জ্বা অনেক আগে থেকেই নিয়মিত বাচ্চাকে এই কথা বলে এসেছেন। একটা ছোট বাচ্চাকে তার মা পঁচা এটা শেখানোর চেয়ে ভয়ংকর কিছু আর হতে পারেনা!
এবার মেয়েটি তার হাসব্যান্ডের কাছে সব শেয়ার করলো কিন্তু হাসব্যান্ড উলটো বললো এটা এমন কিছু নয়। পরে আরো বিভিন্ন জিনিস নিয়ে কথা বলতে গেলে হাসব্যান্ড তাকে মারধর করে, বলে আমাদের বাচ্চা আমার মা যেভাবে পারে যা পারে শেখাবে, এতো আপত্তি থাকলে চাকরি ছেড়ে দাও। অথচ মেয়েটির বেতনের বড় একটা এমাউন্টই সংসারে ব্যয় হয়। মেয়েটি অনেক করে হাসব্যান্ডকে এবং তার পরিবারকে বুঝানোর চেষ্টা করে যে একটা ছোট বাচ্চাকে এসব শেখাতে হয়না কিন্তু তাতে গন্ডগোল আরো বাড়ে। এক পর্যায়ে মেয়েটি চাকরি ছেড়ে দেয়। কিন্তু আজো সেই ভয়ংকর পরিবেশে আছে বাচ্চাটাকে নিয়ে। বাচ্চাটির বয়স এখন ২.৫ বছর এবং সে খুবই ভায়োলেন্ট আর এরোগেন্ট। মাকে সহ্যই করতে পারেনা। সে মেয়েটি কয়েকবার আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েও পেরে উঠেনা বাচ্চার কথা ভেবে!
২। একটি মেয়ে স্কুল শিক্ষক এবং ইন-লজদের সাথে থাকে। মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে স্কুলে জয়েন করে। তার বাচ্চাটা তখন হামাগুড়ি দিতে শিখেছে। হামাগুড়ি দিতে শেখা বা নতুন হাঁটতে শেখা বাচ্চাকে এক সেকেন্ডের জন্যও চোখের আড়াল করার সুযোগ নেই এটা যাদের বাচ্চা আছে তারা জানে। একদিন মেয়েটার কাছে ফোন আসে তার ৮ মাসের বাচ্চা বাড়ির একতলার ছাদ থেকে পড়ে হাসপাতালে। বাচ্চার দাদা ছাদে নিয়ে গেছে এবং ঠিকঠাক সামলাতে পারেনি বাচ্চা পড়ে গেছে। মাথার করোটি ফেটে গেছে। বাচ্চাটির এখন ১৯ মাস বয়স কিন্তু সে হাঁটতে পারেনা, একটি শব্দও বলেনা, প্রচন্ড ট্রমা আর হেড ইঞ্জুরির কারনে কথা বলা আর হাঁটা নিয়ে ডাক্তারও কোন আশা দেয়না। মেয়েটির এটাই প্রথম এবং একমাত্র সন্তান। কিন্তু এই ঘটনার পর সে কাউকে কিছু বলবে কি তাকেই উলটো শুনতে হয়েছে বাচ্চা জন্ম দেয়ার শখ হইলে চাকরি করতে কেন যায়!! সে আজ চাকরি ছেড়ে ওই বাচ্চা নিয়ে হতাশায় মরছে!!
৩। এটি আমার নিজের দেখা ঘটনা। এক বাড়ির ছোট বউ যার একবছরের কম বয়সী ছেলে ছিলো। শাশুড়ির সাথে ছেলের বউয়ের কোন একটা কারনে গন্ডগোল হয় এবং সে শাশুড়ি মেয়ের মাকে ফোন করে এনে বলে মেয়েকে নিয়ে যেতে। যদিও সেই শাশুড়ি যে কি জিনিস তা নিজের চোখেই দেখেছি। মেয়েটির বয়স খুব কম ছিলো, ১৭-১৮ হবে তখন বড়জোর। এবার মেয়েটি যেই তার মায়ের সাথে ছেলেকে কোলে নিয়ে বাড়ি থেকে বাইরে পা দিয়েছে, অমনি কোথা থেকে ভাসুর এসে ছো মেরে কোল থেকে বাচ্চাটিকে নিয়ে বলছে ‘তুই চলে যা, কিন্তু আমাদের বাচ্চা দিয়ে যা’। মেয়েটি একদম হতবাক হয়ে থাকে কিছুক্ষন তারপর কাঁদতে থাকে তার বাচ্চার জন্য। বলে রাখা ভালো সে ভাসুর আলাদা সংসার করেন মানে যৌথ পরিবার নয়, এমনকি যেতে-আসতে বাচ্চার নাম ধরে ডাক দেয়া ছাড়া কোন ধরনের কোন অবদান ওই বাচ্চার পিছনে নেই।
আমাদের দেশের বেশিরভাগ মেয়েরা এখনো প্রেগন্যান্সিতে কোথায় যায় জানেন? মা-বাবার কাছে, একটু আদর-যত্ন সেখানেই পায়, দু-দন্ড শখ পূরণ সেখানেই হয়। ডেলিভারী -সেটাও বাবার বাড়ি। তারপর এই নিউবর্ন নিয়ে রাত জাগা, সদ্য জন্ম দেয়া মাকে দেখভাল করা সেটাও করে মেয়ের মা-বাবারাই। কারন কি জানেন? বাচ্চাটা দাদার বাড়িতে কম-বেশি আদর-যত্ন পেলেও বাচ্চার মা পায়না কারন সে তো পরের মেয়ে। কিন্তু নানার বাড়ির লোকের কাছে বাচ্চার মাও তাদের মেয়ে আর বাচ্চাও তাদের মেয়ের সন্তান। কিন্তু মাঝখান থেকে হঠাৎ করে কিভাবে যেন মালিক হয়ে যায় বাচ্চার বাবা এবং তার বাড়ির লোকেরা। তাদের আচরনে মনে হতে থাকে তারা কিছুদিনের জন্য লিজ দিয়েছিলো বাচ্চাকে ওই বাড়ি। এখনো কতো মেয়ের চাকরির কারনে যে তাদের মায়েরা এই বুড়ো বয়সে নাতি-নাতনী পালতে গিয়ে নিজের আরাম-আয়েশ জলাঞ্জলি দেয় তা আপনার আশে-পাশে তাকালেই চোখে পড়বে।
বাচ্চা কারো সম্পত্তি নয়, সে একটা মানুষ। সুতরাং এর কোন মালিকানা হয়না। মা-বাবাকেই সব থেকে বেশি দায়িত্ব পালন করতে হয়। তবে মাতৃত্ব বা মায়ের যে কষ্ট বা শ্রম তার কাছে অন্যসব বেশ পিছিয়ে। এবার একটা ঘটনা বলি, কিছুদিন আগে আমাদের এক আপুর বাচ্চা হলো, আমরা হাসপাতালে দেখতে গিয়ে রিসিপশনে আনন্দিতার বাবা বললো যে আমাদের ফ্রেন্ডের বেবি হয়েছে আমরা দেখতে এসেছি, বাচ্চার মায়ের নাম এই। এবার রিসিপশনিস্ট রুম নাম্বার খুঁজছিলো কম্পিউটারে, এবার আনন্দিতার বাবা বললো বাচ্চার বাবার নাম… রিসিপশনিস্ট থামিয়ে দিয়ে বললো বাচ্চার বাবার নামের দরকার নেই, মায়ের নামই যথেষ্ট। এটা দিয়ে কি বুঝেন? সভ্য দেশে এটাকেই বলে কার্টেসি। মা একাই যথেষ্ট পরিচয়ের জন্য। আর আমাদের দেশে সে মা-ই সবচেয়ে উপেক্ষিত! বাচ্চার ভালোকিছুর ভাগ নেয়ার জন্য অনেকেই থাকে কিন্তু উনিশ থেকে বিশ হলেই সব দোষ একা সেই মায়ের ঘাড়ে।
ডিয়ার শাশুড়ি আম্মাগন, যার যার বাচ্চা তাকে পালতে দিন। আপনারা তো আপনাদের বাচ্চা পেলেছেনই। এবার আপনার ছেলের বউদেরকে তাদের বাচ্চা পালতে দিন। জ্বী, তারা আপনার চেয়ে বেশিই জানে। কারন আপনারা হয়তো অনেকেই স্কুলেও যাননি কিন্তু তারা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছে, যাচ্ছে। আপনি যখন মা হয়েছিলেন তখন ইন্টারনেট ছিলোনা, চিকিৎসা বিজ্ঞান আজকের মতো এতোটা সমৃদ্ধ ছিলোনা, ডাক্তার দেখানোর এতো সুযোগও ছিলোনা। তাই বলছি আপনার লালন-পালন পদ্ধতির বেশিরভাগই ছিলো অবৈজ্ঞানিক আর অস্বাস্থ্যকর। আপনার নাতি-নাতনীর কোন ক্ষতিতে আপনাকে অতোটা সাফার করতে হবেনা যতোটা ওই বাচ্চার মা-বাবাকে করা লাগবে। প্লিজ পারলে ছেলের বউকে একটু সাহায্য করুন, তাকে এই কঠিন কাজে সাহস দিন৷ আপনিও তো মেয়ে, তাই জানেন কতো যন্ত্রনা এই সময়গুলোতে। দয়া করে নিজের খারাপ অভিজ্ঞতাগুলো বউয়ের জীবনেও চাপিয়ে দিবেননা।
সবশেষে একটা সুন্দর ঘটনা বলি। পরশুদিন একটা ইন্ডিয়ান স্টোরে বাজার করে চেক-আউট করার সময় আমি মেয়েকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ চোখ গেল এক কাপলের দিকে৷ ছেলেটা ইন্ডিয়ান দেখেই বুঝা যাচ্ছিলো, মেয়েটা আমাদের এদিককার নয় নিশ্চিত কিন্তু কোন দেশের তা বুঝতে পারিনি। যাই হোক, তাদের টুইন বেবি (ইদানিং হয়েছে দেখে যা বুঝলাম)। বাচ্চার মা টুইন স্ট্রলারে বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ বাচ্চাদের বাবা এসে বাচ্চার মাকে জড়িয়ে ধরে বলছে ‘ইউ আর ডুয়িং গ্রেট, এ গুড মম ইনডিড’। মেয়েটা খুব সুন্দর করে হাসলো। আমি একদম তাকিয়েই ছিলাম তাদের দিকে, তারা একটু বিব্রতবোধ করলো। কিন্তু কি করবো এতো সুন্দর দৃশ্য সচরাচর তো আমাদের দেশে, আমাদের পরিবারগুলোতে চোখে পড়ে না!!৷
লেখাঃ শারমিন শামুন