দুঃখজনক হলেও এটা সত্য যে আমাদের দেশে বেশিরভাগ মেয়েদেরই সামাজিক ও পারিবারিকভাবে বিশেষ কোন স্বীকৃতি এবং সম্মান নেই। বরং উল্টো তাদেরকে ছোট করা হয়, হেয় করা হয়, অত্যাচারও করা হয়ে থাকে!! প্রেগন্যান্সি কেমন কেটেছিলো জানতে চাওয়া হলে অনেক মেয়েরই দীর্ঘশ্বাস শোনা যাবে নিশ্চিত৷ আর সন্তান জন্মদানের পর তো এই যন্ত্রনাগুলো চূড়ান্ত রুপ নেয়। পৃথিবীতে মানব সভ্যতা টিকিয়ে রাখার পেছনে মেয়েদেরই সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবুও তারাই অনেক বিষয়ে ভোগান্তির শিকার হয়ে থাকে।
কোন মা যখন নিজে হতাশ হয়, অসুখী হয় তখন সন্তানকে সে সুখী এবং আত্ম-বিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে পারেনা। কারন তার হতাশা এবং যন্ত্রনার প্রভাব না চাইলেও সন্তানের উপর পড়ে। আর এই হতাশ, অসুখী মা সংখ্যায় যতো বেশি হবে, হতাশ শিশুর সংখাও ততো বেশি হবে। আর এভাবেই একটা হতাশ জাতি তথা হতাশ পৃথিবী তৈরি হবে৷
আমরা মায়েরা তাহলে কি করতে পারি? যেখানে পরিবার, সমাজ আমাদের অনুকূলে খুব একটা থাকেনা, সেখানে কিভাবে আমরা আমাদের সুখী করতে পারি?? আমরা পারি, আমরা পারি এবং আমরা পারবোই। প্রথমেই আমাদের নিজেদেরকে নিজেদের অনুকূলে আনতে হবে। তারপর আমরা ধীরে ধীরে নিজেকে সুখী করতে পারবো। এখন নিশ্চয়ই আপনি নিজেকে একটু আত্ম-বিশ্বাসী অনুভব করছেন? আবার সাথে এটাও ভাবছেন যে কিভাবে আমি আমাকে সুখী করতে করতে পারি?
নিজেকে সুখী করার জন্য কোন একটি নির্দিষ্ট ফর্মূলা নেই। তবে কিছু ছোট ছোট ভাবনা এবং কাজের মাধ্যমে আমরা নিজেকে সুখী করতে পারি। সেরকম কিছু কাজ/ভাবনা এমন হতে পারেঃ
১। সুন্দর একটি কার্যকরী রুটিন সেট করুনঃ
নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে আপনার সন্তানের এবং নিজের জন্য সুন্দর একটি রুটিন করতে পারেন। রুটিন মেনে চলা মানুষেরা সুখী হয় জীবনে। আর রুটিনে চললে সবকাজ নিয়ম অনুযায়ী হয় এবং তাতে স্ট্রেস কমে। আর বাচ্চার জন্য তো রুটিন আবশ্যক। আপনি খেয়াল করে দেখবেন রুটিন মানতে মানতে আপনার দৈনন্দিন জীবন খুব সুন্দরভাবে চলছে, আপনি এলোমেলো হচ্ছেন খুব কম।
২। পারফেক্ট মাদার হওয়ার বাসনা বা চেষ্টা থেকে বেরিয়ে আসুনঃ
আমাদের সমাজ ব্যবস্থা খুব সুকৌশলে আমাদের মধ্যে পারফেক্ট মা হবার এক বাসনা বা চ্যালেঞ্জ ঢুকিয়ে দিয়েছে আর আমরাও জেনে, না জেনে সেই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছি!!! একটা স্পষ্ট কথা জেনে রাখুন পারফেক্ট মা বলে কিছু নেই। এটা কেবলই একটা মিথ বলা যায়। কারন মানুষ পারফেক্ট হয়না, হতে পারেনা। দোষ-গুন, সফলতা-ব্যর্থতা মিলিয়েই মানুষ। মা যিনি হন তিনিও মানুষ। কাজেই মানুষ পারফেক্ট না হলে, মা কি করে পারফেক্ট হতে পারে বলুন?!
৩। আত্ম-বিশ্বাসী হোন, প্রভাবিত হবেন নাঃ
মা হিসেবেই শুধু নয়, একজন মানুষ হিসেবেও আগে আপনার আত্ম-বিশ্বাসী হওয়া জরুরি। অন্যের অযাচিত, অযৌক্তিক এবং ভুল কথায় কান দিবেন না। কারন তারা আপনাকে আপনার চেয়ে বেশি ভালো জানে না, এবং বেশি ভালোবাসেনও না। নিজের বুদ্ধি-জ্ঞানের সর্বোচ্চ ব্যবহার করবেন৷ কারো হাতে নিজের জীবন তুলে দেয়ার কোন মানে নেই। আপনি সেগুলোই করবেন যা আপনার জন্য ভালো এবং দরকারী।
৪। বাচ্চার খাওয়া ও কান্না নিয়ে নিজের ভাবনা বদলানঃ
বাচ্চারা কখনো খায়, কখনো খেতে চায়না। এগুলো স্বাভাবিক। যদি সিরিয়াস কোন সমস্যা না থাকে তবে এটা নিয়ে ভেবে ভেবে নিজেকে অস্থির করবেন না। আর বাচ্চারা যেহেতু আমাদের মতো করে তাদের আবেগ-অনুভূতি কথায় প্রকাশ করতে পারেনা, তাই তারা কাঁদে, কান্নাই তাদের নিজেদেরকে প্রকাশের ভাষা। আর বাচ্চা যেহেতু তাই ছোট থেকে ছোট বিষয়েও কাঁদে তাই (সিরিয়াস কোন কারন থাকলে আলাদা কথা) কান্নাকে স্বাভাবিক মনে করতে পারলে বা এটা নিয়ে প্যানিকড না হলে মা হিসেবে আপনার জীবনের মানসিক অস্থিরতা ৫০ ভাগ কমে যাবে।
৫। তুলনা নয়, নিজের কি আছে সেটা ভাবুনঃ
প্রতিদিন বা যখনই অন্যের কিছু দেখে হতাশ লাগে তখন আপনার কি কি আছে তা ভাবুন। আরেকটি কথা, ধরুন, X কে দেখলে আপনার খুব হতাশ লাগে, মনে হয় সে কতো সুখী বা সফল৷ নিশ্চিত থাকুন অন্যদিকে Y, Z রাও আপনাকে নিয়ে একই কথা ভাবছে। কাজেই নিজের যা আছে তা নিয়ে কৃতজ্ঞ থাকুন। আর কৃতজ্ঞ মানুষেরা সুখী হয়। আপনার সন্তানের ক্ষেত্রেও একই কথা, অন্যের বাচ্চার সাথে তুলনা করবেন না৷ আপনার সন্তান তার নিজের মতো করে সুন্দর, তার নিজের মতো করে ভালো। তাকে তার মতো করেই ভালোবাসুন।
৬। নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নিনঃ
সুস্থ্য মা মানে সুস্থ্য শিশু, এটা শুধু প্রেগন্যান্ট মায়েদের জন্য না। সব মায়েদের জন্যই প্রযোজ্য। আপনি সুস্থ্য থাকলেই কেবল আপনার বাচ্চাকে সুন্দর সময় দিতে পারবেন এবং যত্ন করতে পারবেন। নিজের দিকে খেয়াল রাখা অনেক বেশি দরকার। কেউ আপনার যত্ন নিবে বা আপনার জন্য ভাববে এটা ভেবে বসে থাকবেন না। শরীর আপনার, যত্নের দায়িত্বও আপনার৷ খাবার খাওয়ার ব্যাপারেও মনোযোগী হবেন। খাবার স্কিপ করবেন না।
৭। নিজের ভালোলাগার কাজগুলো করুনঃ
আপনার রুটিনে প্রতিদিন কিছু সময় রাখুন নিজের ভালোলাগার কাজগুলো করার জন্য। এটা মানসিকভাবে আপনাকে অনেক ভালো রাখবে। আমরা বেশিরভাগ মায়েরাই বাচ্চা হওয়ার পর বাচ্চাকে নিয়ে অতিরিক্ত মনোযোগী হতে গিয়ে নিজের শখ, ভালোলাগা সব যেন ভুলতেই বসি। ফলাফল- হতাশা, রাগ, ক্ষোভ আর যন্ত্রনাময় জীবন। তাতে আমরা দম আটকে কষ্ট পাই এবং ভালো প্যারেন্টিং করতে পারিনা। মানে হিতে বিপরীত হয়!!
৮। ব্যায়াম করুন নিয়মিতঃ
যারা নিয়মিত কিছু ব্যায়াম করেন তারা সাধারণত জীবনের প্রতি খুব পজিটিভ থাকেন। নিয়মিত ব্যায়াম করলে জীবন গতিশীল হয়। প্রতিদিন অল্প করে ব্যায়াম করতে পারেন। সেটা হাঁটাসহ আরো অনেক কিছুই হতে পারে। ইউটিউবের সাহায্য নিয়ে করতে পারেন। আর খুব টেনশন বা অস্থির লাগলে ব্রেদিং (Breathig exercise) এক্সারসাইজ করতে পারেন। এটা খুব কাজে দেয়।
৯। নিজের অবস্থান এবং স্বকীয় পরিচয় তৈরি করুনঃ
আমরা অনেকেই বাচ্চার জন্য নিজের জীবন, ক্যারিয়ার সব ছেড়ে দেই আর ভাবি যে আমার সন্তানসহ পুরো সমাজ আমাকে বাহবা দিবে, ভালো মায়ের উপাধি দিবে। কিন্তু এগুলো আপনার নিজের জন্য আত্মঘাতী ভাবনা ছাড়া কিছুই নয়৷ হ্যাঁ, আপনার এই ত্যাগকে আপনার সন্তান মূল্যায়ন করতে পারে, আবার নাও করতে পারে৷ তবে একজন ডাক্তার মা, ইঞ্জিনিয়ার মা, বা যেকোন চাকরিজীবী মা, উদ্যোক্তা মায়ের সন্তান হতে সে বেশি গৌরব বোধ করবে নিশ্চিত থাকুন। আর মাতৃত্ব তো আপনার জীবনের একটি ধাপ কেবল। কোথাও পরিচয় দিতে গেলে কিন্তু আগে নিজের নাম লিখতে বা বলতে হয়। কাজেই নিজেকে নিজে প্রবোধ না দিয়ে শক্ত হাতে নিজের পরিচয় তৈরির কাজ করুন। স্বামী কিংবা সন্তানের পরিচয়ে নয়, নিজের পরিচয়ে বাঁচুন। সেই মা তো অলরাউন্ডার যে নিজের পরিচয়কে বহাল রেখে মা নামের আরেকটি পরিচয় নিজের জীবনে যুক্ত করে। তাতে করে আপনার স্বামী-সন্তানও আপনাকে সম্মান দিবে। যদি আলাদা কোন প্রফেশনাল পরিচয় ছাড়া কোন মা সুখী এবং সম্মানিত বোধ করেন তবে তা আলাদা বিষয়।
১০। নিজেকে ভাবুন, নিজেকে ভালোবাসুনঃ
এই সবচেয়ে দরকারী কাজটাই কিন্তু আমাদের কাছে সবচেয়ে অবহেলিত। আমরা মা হই-ই যেন নিজেকে ভুলে যেতে, নিজেকে অবহেলা করতে। নিজেকে ভাবুন, নিজেকে সময় দিন এবং নিজেকে ভালোবাসুন। প্রতিদিন আয়নার সামনে ৫ মিনিট দাঁড়াতে পারেন, নিজেকে নিয়ে ভাবতে পারেন। একটু বেশি সময় নিয়ে গোসল করতে পারেন। প্রতিদিন না পারলেও সপ্তাহে দুইদিন এটা করতে পারেন। এতে স্ট্রেস কমে এবং নিজের প্রতি নিজের একটা ভালোলাগা আসে। নিজের ভালোলাগার কোন টিভি শো, কমেডি, মুভি দেখতে পারেন, বই পড়তে পারেন, গান শুনতে পারেন, ডায়েরি লিখতে পারেন, ফল-ফুল-সবজির বাগান করতে পারেন। নিজের জন্য দারুন এক কাপ কফি/ চা বানিয়ে ঘরের বারান্দায় বা ছাদে যেতে পারেন।
১১। নিজেকে নিজে রিওয়ার্ড (Reward) দিনঃ
নিজেকে রিওয়ার্ড দিতে পারেন। এই রিওয়ার্ড বিভিন্ন রকম হতে পারে। কখনো নিজেই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পছন্দের কিছু কিনতে পারেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যেতে পারেন। শখের কিছু কিনতে পারেন। নিজের পছন্দের কোন খাবার রান্না করতে পারেন। আর সবচেয়ে বেস্ট রিওয়ার্ড হলো নিজেই নিজেকে বলা ‘I am doing great’.
১২। হাসুন, হাসুন এবং হাসুনঃ
হাসি মানুষের স্ট্রেস কমায়। আর আমাদের জন্য তো হাসি আরো বড় মেডিসিন। কারন আমাদের ছোট্ট বাচ্চারা সারাক্ষন আমাদের ঘিরে থাকে। আমি নিজে প্রতিদিন আমার মেয়ের সাথে ৫ মিনিট হাসি, অকারনে হাসি, হেসে কুটিকুটি হই। সাথে আমার মেয়েও হয়। মানসিক চাপ কমাতে এটা খুব ভালো কাজ করে। প্রানখুলে হাসুন, আপনার একটি হাসি, আপনার বাচ্চার জীবনে অন্তত পাঁচটি হাসি তৈরি করবে।
১৩। প্রতিদিনের কাজের তালিকা তৈরি করুনঃ
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আপনার সারাদিনের কাজের তালিকা তৈরি করুন। অথবা আগের রাতেই করে ঘুমাতে পারেন। এই টু ডু লিস্ট তৈরি করতে ৫-৬ মিনিটের বেশি লাগবে না হয়তো। এবার একটা একটা কাজ শেষ করুন। আর কলম দিয়ে শেষ করা কাজটা কাটাকুটি করে কেটে দিন। দেখবেন ভাল লাগবে। নিজেকে একটিভ মনে হবে। আমি গুড ফর নাথিং এটা একেবারেই মনে হবেনা। আর তার উপর কোন কাজ মিস হবার বা ভুলে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকবে না। আপনার হয়তো আমাকে একটু পাগল মনে হতে পারে যে খাতায় লিখে কেটে দিয়ে আবার কি সুখ হয়! ধরে নিন আমি পাগল-ই। একবার এই পাগলের কথায় কাজটা করেই দেখুন, কি সুখ, কেমন সুখ তা আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন।
যতোক্ষন না আপনি নিজেকে ভালোবাসছেন, সম্মান করছেন এবং গুরুত্ব দিচ্ছেন, ততোক্ষন পারতপক্ষে কেউ আপনাকে ভালোবাসবে না, সম্মান দিবেনা, গুরুত্ত্ব দিবেনা। নিজেকে ভাবুন, নিজেকে আবিষ্কার করুন। নিজেকে ভালো রাখুন সবার আগে তাহলেই আপনার সন্তান, আপনার পরিবার ভালো থাকবে। পৃথিবীকে একটি সুস্থ্য, সুখী, সফল এবং সুন্দর সন্তান কেবল একজন সুস্থ্য, সুখী মা-ই দিতে পারেন।
লেখাঃ শারমিন শামুন
All of these are helpful for a new mom. Thanks!