You are currently viewing Put Your Love And Kindness First

Put Your Love And Kindness First

  • Post comments:0 Comments

বাচ্চাকে কখনোই বকা দেয়না এমন মা-বাবা বিরল। আবার অনেকেই মেজাজ হারিয়ে মেরেও বসেন। ৯ মাস প্রেগন্যান্সি এবং ডেলিভারির যন্ত্রনার চেয়েও ঢের বেশি যন্ত্রনাদায়ক বা কষ্টের বাচ্চাকে লালন-পালন করে বড় করা। এটা আমার ব্যক্তিগত মত। কারন আপনি যখন প্রেগন্যান্সিতে ছিলেন, তখন জানতেন এই তো আর কিছুদিন তারপর ঠিক হয়ে যাবে বা এই কষ্টের সময় শেষ হয়ে যাবে। আবার, তখন শুধু আপনি খেলেই বাচ্চার খাওয়া হয়ে যেত৷ বাচ্চাকে আলাদা করে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, গোসল করানো, তার সাথে খেলা, পড়া, তার ডায়পার চেইঞ্জ করা, কান্না থামানো এসব করতে হতোনা!।

কিন্তু বাচ্চার জন্মের পর হঠাৎই অনেক কাজ বেড়ে যায়, আর এই বেড়ে যাওয়া কাজ সামনের দিনগুলোতে আরো বাড়তেই থাকে। এই বাড়তি কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খাই আমরা আর নিজের মনের কাছে সব অসহনীয় হয়ে উঠে– জীবন, বাচ্চা,  সম্পর্ক  থেকে শুরু করে সবকিছু। কিন্তু আমাদের সামাজিক ব্যবস্থার কারনে মুখ ফুটে বলার সুযোগ নেই বা থাকেনা যে আমি ক্লান্ত, আমাকে একটু  বিশ্রাম নিতে দাও। কারন আমাদের দেশে মায়েদের ক্লান্ত হওয়ার অধিকার নেই বললেই চলে, তার উপর আবার খারাপ মায়ের তকমা পাওয়ার ভয় তো আছেই।  আর এই সার্বিক পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভিকটিম হলো কোলের ছোট শিশুটি। সকল হতাশা, রাগ, ক্ষোভ, ক্লান্তি ঢেলে দেওয়ার জন্য তাকে আমরা খুব সহজেই বেছে নেই৷ যেহেতু তার কাছ থেকে পাল্টা আঘাত, প্রতিবাদ কিছুই আসেনা, তাই আরো সহজেই তাকে পেয়ে বসি। অনেকে আবার স্বভাবসুলভ কারনেও বাচ্চাকে মারেন।

বাচ্চাকে মারধর করা, বকাঝকা করা অনেকখানি ধুমপানের মতো বলা যায়। যেমন আপনি শুরুতেই টের পাবেন না ঠিক কতখানি ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই ক্ষতি হচ্ছে। আপনার ভেতরের সুস্থ্য-সুন্দর parts গুলো দিনে দিনে নষ্ট হয়ে বিকল হতে শুরু করে। ঠিক তেমনি যখন কোন বাচ্চা দিনের পর দিন মারধর আর তিষ্কারের মধ্যে বড় হয় তখন তার ভেতরের সুন্দর মানসিকতা এবং মা-বাবার সাথে সম্পর্কে দেখা দেয় ক্যান্সার!!! আমরা বড়রা বলে থাকি বা মেনে থাকি যে আপন মানুষ দুঃখ দিলে তা মানা যায়না। কিন্তু সন্তানের কাছে তার মা-বাবা যে আপনার চেয়েও আপন, তো মা/বাবার দেয়া দুঃখ একটি ছোট্ট শিশুর জন্য কতোটা ভারী, কতোটা যন্ত্রনার আমরা কি তা ভেবে দেখি?!

যারা বাচ্চাকে মারেন বা খুব বকাঝকা করেন তারা কিভাবে এগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন এই বিষয়ে কিছু ছোটখাটো টিপসঃ

**প্রতিদিন সকালে উঠে প্রতিজ্ঞা করুন যে আজকে দুপুরের আগে বকা দিবেন না/ মারবেন না। এবার দুপুরে প্রতিজ্ঞা করুন রাতের আগে নয়। এবার রাতে প্রতিজ্ঞা করুন আগামীকাল সকালের আগে নয়। এভাবে এক সপ্তাহ চেষ্টা করেই দেখুন, অনেকটা পাল্টে যাবেন আপনি এবং আপনার সন্তানও। আর যদি কোন বেলায় আপনি প্রতিজ্ঞা ভেঙে ফেলেন, তাতেও হাল ছেড়ে দিবেন না। পরের বেলার প্রতিজ্ঞাটা ঠিকভাবে পালন করুন। এগুলো রাতারাতি ঠিক হয়না এটা সত্য, তবে ইচ্ছা থাকলে পরিবর্তন করা যায় এটা আরো বড় সত্য। 

**আপনার হাসব্যান্ড বা বাসার কাউকে বলে রাখতে পারেন যেন আপনি যখন আপনার বাচ্চাকে বকা দেন বা মারেন সেটা যেন অডিও/ভিডিও করে রাখে। আপনি পরে যখন ঠান্ডা হবেন সেটা আপনি শুনবেন/দেখবেন। আমি বিশ্বাস করি আপনি আঁতকে উঠবেন, ভয় পাবেন, হতাশ হবেন, অনুতপ্ত হবেন যে  আপনার আদরের ছোট্ট  বাচ্চাটির সাথে আপনি কি করেছেন, কিভাবে কথা বলেছেন, কি ভাষা ব্যবহার করেছেন!!! এটা আপনাকে দারুনভাবে সাহায্য করবে নিজেকে পাল্টাতে।

** পর্যাপ্ত ঘুমানোর চেষ্টা করবেন। আমরা মায়েরা কিন্তু  খিটখিটে হয়ে যাওয়ার পিছনে একটা অন্যতম বড় কারন পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব। প্রেগন্যান্সি থেকে শুরু করে নবজাতক নিয়ে  দিনের পর দিন রাত জেগে জেগে আমাদের মস্তিষ্ক খুব এলোমেলো/অস্থির থাকে। আমরা একটা লম্বা সময় পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে ভুগি। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রাতে ঘুমিয়ে পড়বেন যেন ভালো ঘুম হয়। বাচ্চার ঘুমের রুটিনকে আপনার রুটিনের সাথে মিলিয়ে নিলে বেশ সহজ হবে বিষয়টি।

** আপনার প্রতিবেশী আপনাকে শুনছে আপনি যে বাচ্চার সাথে চিৎকার করছেন বা তাকে মারছেন এটা ভুলে যাবেন না। এটা মাথায় রাখলেও আপনি অনেকটা নিয়ন্ত্রিত আচরন করতে পারবেন।

** নিজের পছন্দের কাজ-বই পড়া, সিনেমা দেখা, গান শোনা,  ছবি আঁকা থেকে শুরু করে যাই হোক না কেন প্রতিদিন একটু করে করার চেষ্টা করুন দেখবেন আপনি দিনে দিনে অনেক বদলে যাচ্ছেন। আপনার রাগী রাগী অসহ্য মনোভাব পাল্টে যাচ্ছে।

** নিজেকে সময় দিন, নিজের যত্ন নিন, নিজেকে ভালোবাসুন। তাতে করে  দেখবেন অনেক কিছু সহজ লাগছে, ভালো লাগছে, স্বাভাবিক লাগছে। আমরা যখন নিজেদের বঞ্চিত মনে করি বা বাচ্চাকে বা মাতৃত্বকে আমাদের অন্য কোন ইচ্ছা বা শখের বা স্বপ্নের অন্তরায় ভাবি বা ভাবতে শুরু করি তখনই আমরা বাচ্চার উপর বেশি ক্ষিপ্ত হই বা ক্ষিপ্ত হতে শুরু করি। আপনি যখন নিজেকে ভালোবাসবেন,  নিজেকে যত্ন করবেন তখন এই বোধগুলো কমে আসে।

** নিজের ভুল স্বীকার করুন। বাচ্চাকে সরি বলুন। সে যতোই ছোট হোক বয়সে, আপনার কথা বুঝুক আর নাই বুঝুক, তবুও বলুন। তাতে করে আপনার বাচ্চাও শিখবে কিভাবে নিজের ভুল স্বীকার করতে হয়।

**প্রতিদিন ১০ মিনিট সময় রাখুন নিজের প্যারেন্টিং নিয়ে ভাবার জন্য। সেটা গোসলের সময় হতে পারে, চা খাওয়ার সময় হতে পারে, অলস দুপুরে হতে পারে যখন বাচ্চা ন্যাপ নেয় বা আপনার সুবিধামতো যেকোন সময়ে। তবে এটা করবেন অবশ্যই। তাতে করে আপনি নিজেই বুঝবেন আপনার কোন দিকটা পরিবর্তন করতে হবে, কোথায় আপনাকে আরো বেশি সময় দিতে হবে।

** যখনই বুঝবেন আপনি রেগে যাচ্ছেন সম্ভব হলে কারো সাহায্য নিন অথবা বাচ্চার সামনে থেক চলে যাবেন। এক গ্লাস পানি খাবেন, ১-১০ পর্যন্ত গুনবেন। আপনার যদি এবার নিজেকে হালকা লাগে তবেই বাচ্চার কাছে যাবেন।

** আপনার বাচ্চাকে যখন ধমক দেন বা মারেন তখন আপনি অন্য কেউ হয়ে যান, হিতাহিত জ্ঞান থাকেনা, তাই তো?? তাহলে যখন আপনার জ্ঞান থাকে তখন দয়া করে একটু ভেবে দেখবেন ঠিক এই আচরনগুলো যদি কেউ আপনার সাথে করে ঠিক কেমন লাগবে আপনার? এটা যদি ভাবেন এবং উপলব্ধি করতে পারেন তাহলে আপনি ঠিক বুঝতে পারবেন যে আপনার যতোটা খারাপ লাগতো বাচ্চাটির তার চেয়েও বেশি খারাপ লাগে। কারন সে নেহায়েতই ছোট শিশু যার ইমোশনের উপর কোন নিয়ন্ত্রন তৈরি হয়নি এবং একই সাথে আপনিই তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্র‍য় যে কিনা তাকে ধমক দিচ্ছেন/মারছেন!! তখন সে বড্ড অসহায় বোধ করে!

**বাচ্চাকে যেমন দেখতে চান, আগে নিজে তা করুন। তাতে করে বাচ্চার উপর রাগ করার খুব বেশি সুযোগ আপনি পাবেন না নিশ্চিত করা বলা যায়। কারন বাচ্চা অনেকখানি আপনার পছন্দের বা মনের মতোন হয়ে যাবে।

ভালোবেসে যদি কিছু শেখানো হয় তা অনেক বেশি কার্যকরী হয়। মারধর, ভয় একদিন ঠিক কেটে যায় । কিন্তু ভালোবেসে, মমতা দিয়ে, যত্ন করে শেখানো শিক্ষাটা জীবনভর রয়ে যায় কারন এর শিকড় অনেক গভীর পর্যন্ত যায়। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি  সুন্দর, আদুরে, নিষ্পাপ আর অসহায় এই শিশুরা। আসুন, আমরা সবাই প্রতিজ্ঞা করি আজ থেকে শিশুদের প্রতি সহনশীল হবো, শিশুদেরকে ভালোবাসবো। আমাদের নিষ্ঠুরতার কোন ছায়া তাদের উপর পড়তে দিবো না।

লেখাঃ শারমিন শামুন

Leave a Reply