বাসায় ছোটদুইটা বাচ্চা থাকার জন্য আমার ভাই ভাবী শুরু থেকেই প্রচন্ড কেয়ারফুল ছিল।ফুল প্রটেকশন নিয়ে ভাইয়া উইকে একদিন বের হয়েছিল বাসার জিনিসপত্র কেনাকাটার জন্য। সেই ভাইয়া জখন বলছে গলা ব্যাথা গা গরম তখন প্রাথমিক ভাবে মাথাতেই আসেনি এইটা কোভিড হতে পারে।১৭তারিখে ভাইয়ার রিপোর্ট পজেটিভ আসে, তখন আমি ২/৩ সেট কাপড় ব্রাশ আর ফোনের চার্জার নিয়ে ভাইয়ার বাসায় শিফট হই আম্মা প্রচন্ড ভয় পাচ্ছিল আমাকে নিয়ে কিন্ত আমি ভয়ের তোয়াক্কা করিনি ৷ভাইয়ার পজেটিভ রিপোর্ট আসার একদিন পরে ভাতিজির জর, তার একদিন পরেই ভাবী।ভাইয়ার লক্ষন ছিল প্রচন্ড জর, কাশি গলা ব্যাথা গা ব্যাথা, ভাতিজি কম্পলেইন করছে ফুপু গা ব্যাথা খুব গলায় খুব ব্যাথা।ভাবীর ও সেম।ভাইয়ার জর একবার উঠলে আর কমতে চায়না, ভাবি, ভাতিজির জর উঠানামা করত।আমি ২০তারিখ রাতে প্রথম বুঝি গা ব্যাথা সাথে গলায় অসস্তি।আমার ২১তারিখে প্রথম জর আসে আর সেই সময় থেকে নেক্সট ১০দিন ঠিক সন্ধায় জর আসছে। গলার কাছে কি জেন একটা আটকে থাকার অনুভুতি। আমি কোন স্মেল পাইনা খাবার এর, সাথে মুখে কোন সাদ নাই। কুর্মিটোলা হাসপাতাল এর ডাক্তার এর ক্লজ অবজার্ভেশনে আমরা চারজন ছিলাম।আমাদের এজ ভিন্ন মেডিসিন ও ভিন্ন। ডাক্তার এর কথার বাইরে আমরা কেউ একটা অসুধ খাইনি। ভাইয়া পজেটিভ হবার সাথে সাথে অক্সিমিটার কিনে নিয়ে আসছিলাম আমি। জেহেতু ভাইয়াকে নিয়ে প্রচন্ড ভয়ে ছিলাম তাই বাসায় অক্সিজেন সিলিন্ডারও রেডি ছিল।
জে এন্টিবায়োটিক খেয়ে ভাইয়ার জর কমে গেছে, ভাবীর জর কমে গেছে আমি ও আশাবাদী হয়ে উঠছিলাম আমার ও কমে যাবে কিন্ত তার কিছুই হলনা। আমি ৭ দিনের জায়গায় ১০দিন এন্টিবায়োটিক খেয়ে বহু কস্টে জরকে নিজের নাগালে নিয়ে আসছি।খেতে পারতাম না, সবকিছু তিতা আর লবন লাগত।আমি গরম পানি দিয়ে কুলি করতে গেলে বমি করে ফেলতাম তাই গরম পানি খেয়ে নেয়া বেশি প্রেফার করেছি। মশলা চা ( আদা তেজপাতা লং ফোটানো পানিতে চা দিয়ে খেতাম বেশি করে)
আমার কিটো ডায়েটের অভ্যাস ছিল আর সেই জন্য আপেল সাইডার ভিনেগার খেয়ে গেছি প্রতিদিন।ভিটামিন সি ( লেবু মাল্টা রেগুলার খেয়ে গেছি)
আম্মা চাররকম মশলা বেটে একটা আচার এর মত বানায়ে দিয়েছিল অইটা কাশির সময় খুব আরাম দিয়েছে। এখন পর্জন্ত আমি জা জা লিখেছি তার সবকিছুই আমরা জানি মোটামুটি। এখন অইগুলা লিখছি জা আমাদের অজানা।ভাইয়া কোভিড পজেটিভ শোনার পর থেকে ভাইয়ার বাসার প্রতিবেশিদের দারা আমরা প্রচন্ড ভাবে হেনস্থা হয়েছি। পুলিশ এসে বাসায় লাল পতাকা আটকে দিয়ে গেছে সাথে যাচ্ছেতাই ব্যাবহার প্রতিবেশীদের কন্টিনিয়াস ফোন । আমাদের বাসার জিনিসপত্র বাজার অসুধ দিয়ে যাবার জন্য ড্রাইভারকে বাসার সিড়িতে আসার অনুমতি পর্জন্ত দেয়া হয়নি। আমার ধারনা আমরা জদি আর একটু দুর্বল সামাজিক অবস্থান এর মানুষ হতাম আমাদের হয়তো বাসা ছাড়ার নোটিশ পেয়ে বসতাম!!!!
বাসার সবাই আমরা কোভিড পজেটিভ ছিলাম কিন্ত এরমানে কিন্ত এইনা আমরা বাসায় জে জার মত চলাফেরা করেছি ভাবী তার ছেলেকে ফিডিং করানোর সময় ও মাস্ক পরে থেকেছে ।ভাইয়া তার রুমে বদ্ধ সেই ১৭ তারিখ থেকে গতকাল দুপুরে সে প্রথম তার রুমের বাইরে আসছে বাচ্চাদের কোলে নিয়েছে , রুমের সামনে রাখা চেয়ারে আমি খাবার পানি সবকিছু দিয়ে আসতাম।ভাইয়ার তিনবেলার খাবার ডিস্পোজেবল বক্সে ভরে দিতাম, আর রুমে ইলেকট্রিক কেটলি পানির ফ্লাস্ক রাখা ছিল।
কোভিড ভাইরাস এক একজনের উপর এক এক রকম ইম্প্যাক্ট ফেলবে। আমি আর ভাইয়া জরে ভুগেছি ভাতিজি ভাবী এতো জরে সাফার করেনি।ভাইয়া আর আমি কাশি নিয়ে কস্ট পেয়েছি, আমি সবচেয়ে বেশি কস্ট পেয়েছি গা জালাপোড়া নিয়ে, শাসকস্ট নিয়ে। আমাদের পেটের ট্রাবল হয়নি আলহামদুলিল্লাহ।
আপনার লক্ষন নাই আপনি সাধীন এবং গায়ে ফু দিয়ে ঘুরে বেড়াবেন এইটা একটা মারাত্মক ভুল কাজ হবে। আপনি নিজেও জানবেন না কখন আপনি আরেকজনকে ভাইরাস দিয়ে দিচ্ছেন।আমি আগেও লিখেছি আবার ও লিখছি নিজের শরীরকে বুঝুন, ফিল করুন।কোন রকম ডিসকম্ফোর্ট ফিল করার সাথে সাথে আলাদা করে নেন নিজেকে।
কোভিডকে হেলাফেলা করার মত ভুল করবেন না।ওজন কমানোর প্রসেসে ছিলাম জানুয়ারি মাস থেকে সেই জন্য বলব আমার রক্তে সুগার এর পরিমান ছিল নিয়ন্ত্রণে। ডায়েট এর সাথে আমার এক্সেরসাইজ এর প্রাক্টিস ছিল। আমি গত জানুয়ারি থেকে খুব কম দিন ছিল জেদিন ফিজিক্যাল এক্সেরসাইজ স্কিপ করেছি ,ব্রিদিং প্র্যাক্টিস চালায়ে গেছি। ।সুগার জদি আগে থেকে কমায় না রাখতাম আর ওজন জদি কমায়ে নিয়ে না আসতাম কোভিড জার্নিটা জিতে যাওয়া ডিফিকাল্ট হত আমার জন্য, হয়তো ধুকে ধুকে কস্ট পেতাম আরো বেশি মরে যাওয়াও অসাভাবিক হত না। টানা লম্বা সময় এক পাশ ফিরে ঘুমাতাম না, লম্বা সময় ধরে পানি না খেয়ে থাকলে খেয়াল করতাম গলা ব্যাথা করছে,কাশি উঠে যাচ্ছে। এই ক্ষেত্র আমার ছোট্ট এক্টা সাজেশন হল মাথা কিছুটা উচু রেখে ঘুমানো বা রেস্ট করবেন।দম আটকে আসার অনুভূতি হবে না, হাতের কাছে পানি / জুস / সুপ জা পাবেন তাই রাখবেন, গলা কোন অবস্থায় ড্রাই হতে দেয়া যাবেনা।
কোভিড পজেটিভ এর স্ট্রেস এর জতটা শারিরীক তার চাইতে বেশি মানসিক।আমি প্রচন্ড জরে ছটফট করছি কিন্ত আমার পাশে কেউ নাই ( প্র্যাক্টিক্যালি) ঈদের দিন সকালে উঠে মনে হল আল্লাহ জদি আমাকে এই রকম কঠিন একটা দিন দেখাতে পারেন,তাহলে সেই পরীক্ষায় পাশ করার দায়িত্ব আমার নিজের আমি হার মানব না, কেদেকেটে একাকার করে গরম পানি প্লাস্টিকের বড় মগে নিয়ে বসে জোরে জোরে শাস নিয়ে নিজের মদ্ধে টেনে নিছি । আমি আম্মার ন্যাওটা প্রচন্ড রকম, যখন বুঝতে পারছি কথা টেনে যাচ্ছে আমার তখন কথা বলাও কমায় দিয়েছি আম্মার সাথে।
আমি বারবার আমার লিখার মাধ্যমে সবাইকে সচেতন করতে চাই এই বলে খুব সাবধানে থাকুন,কিভাবে ইনফেক্টেড হলেন এইটা নিয়ে জদি কুল কিনারা না পান তাহলে লুক ফরোয়ার্ড। নিজেকে সেভ করেন ফ্যামিলির বাকি সবার টেক কেয়ার করেন, হাত ধোয়া, স্যানিটাইজ করা, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কোন বিকল্প নাই। গরম পানি খান সারাদিনে গোটা দশেকবার, এইটা একটা রেগুলার ফ্যামিলি ইভেন্ট ক্রিয়েট করুন সবাই একসাথে বসে গরম পানি খান। আমি এই জীবনে আর কখনো ঠান্ডা পানি ছুয়ে দেখবনা বলে শপথ করেছি।
ফ্যামিলির সবাই মিলে খান,গরম পানি ভাল্লাগেনা মধু এড করেন, আদা কুচি এড করেন
আমাকে জদি বলেন কি এন্টিবায়োটিক খেয়েছেন তাহলে বলব আমি একজন ফার্মেসী অনুসদের ছাত্রী।আমি কোনভাবেই আমার মেডিসিন এর নাম শেয়ার করব না কারন এজ এবং সিম্পটম অনুসারে মেডিদিন চেঞ্জ হয়েছে তবে হ্যা একটা কথা আমাদের ডাক্তার সবসময় জিংক ট্যাবলেট নিতে বলেছেন আমরা সবাই জিংক সাপ্লিমেন্ট খেয়ে গেছি। ভিটামিন সি ট্যাবলেট পছন্দ না আমার কোন কালে। আমি গোটা লেবু গোটা মাল্টা চিপে খেয়ে নিয়েছি বারবার করে। শরীর এর টেম্পারেচার মনিটরিং করেছি রেগুলার কারন আমার সিম্পটম ছিল গা হাত পা বরফ এর মত ঠান্ডা কিন্ত জর ১০২ ডিগ্রি।জর জখন কমে আসত তখন তাপমাত্রা ৯৪/৯৬ ডিগ্রি হয়ে জেত।
আমি সর্বোপরি শোকরগুজার করি আল্লাহতালার কারন আমি এই রকম অসুখে ভুগব এইটা তার প্লান এর অংশ ছিল,এবং আমি সব অবস্থায় আলহামদুলিল্লাহ বলার সাহস রাখি৷ আমার বড়ভাইয়ার ফ্রেন্ড এর জিনি আমাদের সর্বোচ্চ মনিটরিং করেছেন।আমার ছোটভাই আরিফ ইকবাল এর ব্যাক্তিগত পর্জায়ের কন্টাক্ট এর মাধ্যমে আমরা টেস্ট করানো নিয়ে কোন রকম বিড়ম্বনা/ লম্বা কিউ ফেস করতে হয়নি। আমাদের স্যাম্পল বাসায় এসে নিয়ে গেছে। বাসায় পিপিই পরা লোকজন + গাড়ি জাতায়াত দেখে প্রতিবেশিদের মনে আতংক আরো বেড়ে গেছে!!!!
আজকে আমি সুস্থ কিন্ত এর মানে এইনা সবকিছু ঠিকঠাক।আমি ভাইরাস কেরিয়ার হিসেবে আম্মাকে ইনফেক্টেড করতে পারি তাই ১৪দিন না হলে নিজের বাসাতেও ফিরব না।
আমার এতো বড় পোস্ট পড়ে জদি আপনার এতোটুকু উপকার হয় তাহলে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করব। সবার কাছে রিকোয়েস্ট জদি অসুস্থ হয়ে পড়েন তাহলে ডাক্তার এর সাথে কথা বলেন দেরি না করে,ভয় লজ্জা কি করব কি হবে এইসব কিছু মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দেন। আপনার প্রতিবেশী আত্মীয় সজন দের হলে তাদের পাশে দাড়ান, হেল্প করেন, খাবার রান্না করে পাঠান জিজ্ঞেস করেন কোন ভাবে তাদের কোন হেল্প করতে পারেন কিনা।আমাদের এই দুর্দিনে চরম কানাডায় থাকা রোয়েনা আপা আমাদের জন্য খাবার এরেঞ্জ করে দিয়েছেন, ভাইয়া ভাবীর ফ্রেন্ড / কলিগ, আমার আম্মা রান্না করে পাঠাত বলে হয়তো প্রায় ৭/৮দিন বাসায় রান্না করে খেতে হয়নি।
আমাদের রিপোর্ট নেগেটিভ হওয়া থেকে ১৪দিন পর আমরা প্লাজমা ডোনেট এর জন্য এলিজেবল হব।সো এন্টিবডি টেস্ট এর পরে আমি এবং ভাইয়া অবশ্যই প্লাজমা ডোনেট করব ইনশাআল্লাহ। আমাদের দুই ভাইবোনের ব্লাড গ্রুপ খুব সহজলভ্য না।
আমার জন্য দোয়া করবেন জেন হাই পাওয়ার এন্টিবায়োটিক এর ধকল আমি কাটায়ে উঠতে পারি আগের মত সুস্থ সবল হয়ে চলা ফেরা করতে পারি।
একবার আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে যাওয়াই মানেই সবকিছু না, আমি আগের থেকে আরো ক্রিটিক্যাল ভাবে ভাইরাসের কেরিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারি।
“সো স্টে কেয়ারফুল “
হেলাফেলার সুজোগ নেই একদম!
লাস্ট একটা মেসেজ
“আমি সহ আমার পুরা ফ্যামিলির জন্য দোয়া আর কনসার্ন দেখানোর জন্য। আপনাদের কন্সটেন্ট মেন্টাল সাপোর্ট অনেক শক্তিশালী ছিল আর আমাদের জন্য মেন্টাল স্ট্রেথ এর কাজ করেছে।
টাকা পয়সা দিয়ে আপনি সবকিছু কিনে নিতে পারবেন মানুষ এর মমতা আর ভালোবাসা টাকা দিয়ে কিনে নিতে পারবেন না।
ক্লজ ফ্রেন্ড / বেস্ট ফ্রেন্ড / জানের বান্ধবী /রিলেটিভদের প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ অনেক কিছু শিখায়ে দিয়ে গিয়েছে এই কোভিড ১৯ । চারবছর আগে একবার শিখেছি এই বছর আবার শিখেনিলাম।
আলহামদুলিল্লাহ
আরোকিছু জদি শেখার বাকি থাকে তাহলে সময় মত তাও শিখে নিব!
By: AAmina Fatema Iqbal Liz