#নীহা, #অসংখ্য নীহা,
#যাকে বা যাদেরকে সম্মান দিতে সমাজকে কুন্ঠিত হতে হয় সবসময়।
(বেশ লম্বা পোস্ট, ধৈর্য্য আবশ্যক).
মেয়েটির নাম নীহা।ছোটবেলায় নানা অনেক শখ করে ডাকতেন নীহারিকা, সংক্ষেপে নীহা।
নিজ আলোয় জগৎ আলোকিত করার মতো কেউ না হলেও নিজ ভুবন আলোকিত করার মতো একটি মেয়ে। শিক্ষিত, স্বাবলম্বী, আত্মবিশ্বাসী একজন মেয়ে,দেশের আরো অনেক মেয়ের মতই। আলাদা কোন গল্প নেই তার।আজকেও আলাদা কিছু বলার নেই তার।সহজ সাধারণ আর দশটা মেয়ের মতই কাহিনী তার। সে যখন ক্লাস ফাইভে পড়ে,তখনই প্রথম সে পায় অপ্রীতিকর সেই স্পর্শ, যা প্রতিটা মেয়েই জীবনের কোন না কোন সময় মার্কেটে, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এ কিংবা যেকোন ভিড়ের মধ্যে অনুভব করেছে। কাউকেই কিছু বলতে পারছিলো না সে,কিছু বুঝেও উঠতে পারছিলো না। কতটা অস্বস্তিকর সেই অনুভব তা বোধ করি বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। সেই ছিলো প্রথম,কিন্তু সেটা থামেনি কখনোই। অনেকেই বলবেন,ভিড়ের মধ্যে এমন হতেই পারে,না গেলেই তো হয়!!! হ্যাঁ, সে এখন আর মার্কেটে যায়না।অনলাইন শপিং এর যুগে সবকিছু তো ঘরেই পাওয়া যায়,কি দরকার!!! কিন্তু তাতেই কি সবকিছুর সমাধান??? কি যে বলেন!! এতো অল্পতেই কি আর একটা মেয়ের দুর্গতি শেষ হয়ে যায়??? 🙂
সে যখন ক্লাস নাইনে উঠলো, তখন থেকে শুরু হলো নতুন করে সেই দুঃস্বপ্ন। যতবারই সে তার নানাবাড়িতে যেতো, বাসায় ফেরার সময় রিকশা বা গাড়িতে উঠার সময় তার মামাতো ভাই,যে কিনা তার চেয়ে বয়সে আড়াই বছরের ছোট, যাকে কিনা মেয়েটি স্নেহ করে “ভাইয়া” বলে ডাকতো,সেই ভাইটি কথা বলতে বলতে তাকে সেই মার্কেটের নোংরা স্পর্শের কথা মনে করিয়ে দিলো। কিভাবে?? ভাইটা তো জানেই না এই বিষয়ে, তাহলে কিভাবে মনে করাবে?? Practically, আর কিভাবে? মেয়েটি বুঝে উঠতে পারছিলো না কাকে বলবে, কিভাবে বলবে,কিভাবে বিশ্বাস করাবে।এসএসসি পরীক্ষার পর মেয়েটা ছুটি কাটাতে যখন নানাবাড়িতে যায়,এক দুপুরে সে ঘুম থেকে পাগলের মতো উঠে কারণ তাকে ঘুমের মধ্যে সেই ছোট ভাইটি বাজে ভাবে স্পর্শ করেছিল। মেয়েটি পাগলের মতো ছুটে যায় নিজের বাসায়,যাওয়ার আগে নানাবাড়ির আত্মীয়দেরকে বলে যায়।ছেলেটার মা মানে তার মামীকে সবকিছু খুলে বলে। সেইদিন যদি সেই ছেলেটাকে বুঝানো হতো তার কাজটা কতটা জঘন্য, তাকে শেখানো হতো সম্পর্কের মর্যাদা, তাহলে হয়তো মেয়েটি ভবিষ্যতে ঘটে যাওয়া আরও বড় দুঃস্বপ্ন থেকে রেহাই পেত। তারপরে কেটে যায় অনেকদিন।মেয়েটি এক সময় সেই ভাইকে ক্ষমা করে দেয়। ভাবে,সময়ে হয়তো সবকিছু স্বাভাবিক হবে। খারাপ লাগতো যখন সে ভাবতো কেউ কেন সেই বাজে ঘটনার বিচার করলো না। মেয়েটি কখনোই কোন কিছুর বিচার পায়নি।এটা তারই নিজের প্রতি অবহেলা নাকি তার সিদ্ধান্ত অন্যের উপর ছেড়ে দেওয়ার ফসল সে জানেনা।
মেয়েটি গল্পের বই পড়তে ভালবাসতো। বই পড়া ছিলো তার নেশার মতো। এই অভ্যাস তার আত্মীয় স্বজন সবারই মোটামুটি জানা ছিলো। সেই তথ্য কাজে লাগিয়েই,মেয়েটির জ্ঞান ভান্ডার সমৃদ্ধ করতে একদিন তারই হাতে একটা চটি বই তুলে দিয়েছিল তারই কোন এক মামা। মেয়েটি লজ্জায় অপমানে কাউকে কিছু বলতে পারেনি।তখনকার সময়ে সবকিছু যে অপমানের ছিলো শুধু তারই জন্যে!!! সে কিভাবে কাউকে বলবে???
মেয়েটি তার মেডিক্যাল কলেজের গ্র্যাজুয়েশনে থাকাকালীন সময়ে একদিন তারই এক সম্মানিত স্যার তার হাতে এমনভাবে স্পর্শ করেছিলেন,যে সে বাধ্য হয়েছিলো সেখান থেকে কোনমতে সরে আসতে।
এই সময়েই তার জীবনে ঘটে আরেকটা অপ্রীতিকর ঘটনা। তার কিছু morphed picture কিছু কুৎসিত মানসিকতার মানুষ(মানুষই বলবো কারণ কোন প্রাণীর সাথে এদের তুলনা করলে সেই প্রাণীর অপমান হবে,আর এসব কেবল মানুষের দ্বারাই সম্ভব) ফেসবুকে দিয়ে দেয়। সবার মধ্যে হৈহৈ রব,গেলো গেলো মেয়েটা উচ্ছন্নে গেলো।। মেয়েটার so called এক বান্ধবী ক্লাসে বসেই তাকে বলছিলো,”জানিস,অমুক আমাকে কল দিয়ে বলছে মেয়েটার কারণে কম্পিউটার অন করতেই স্ক্রিনে বাজে ছবিগুলো আসলো।ছিছিছি ক্যামনে পারলো সে?”
এমনকি মেয়েটার সেই মামাতো ভাই মেয়েটাকে ফোন করে বললো,”আমার সময় তো খুব বিচার দিয়েছিলে।আমি তো নিজের মানুষ (!!!) ছিলাম।এখন যে এসব নষ্টামি করলে,এখন কি করবে? ছি ছি ছি।”
মেয়েটা কিছু বলতে পারছিলো না,বুঝতেই পারছিলো না কি করবে। এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেয় আত্মহত্যা করবে,খেয়ে ফেলে ঘুমের ওষুধ। তখন বুঝে নি পাঁচটা ঘুমের অষুধের ইফেক্ট হিসেবে সে পুরো একদিন ঘুমিয়েই কাটাবে। ভালোই হয়েছিলো সেদিন সে মরেনি। কিন্তু বুঝতে পারছিলো না,কিভাবে পরদিন থেকে ক্লাসে যাবে,কিভাবে সবাইকে মুখ দেখাবে। তখন একজন মানুষ শুধু তার পাশে ছিলেন,বিশ্বাস করেছিলেন তাকে নিঃশর্তভাবে।তার মা।সেই মানুষের ভরসায় সে সাহস পায় আবার উঠে দাঁড়ানোর আর সেই সাথে দুই-একজন ভালো বন্ধু। যাদের সাহায্যে প্রমাণ হয় ছবিগুলো morphed এবং সেই ছবিগুলো সরেও যায় ফেসবুক থেকে।কিন্তু থেকে যায় এক কুৎসিত প্রকৃতির অমানুষের কাছে। বুঝতে পারছেন কি কে সে? হুম,সেই ভাআআআই।
ঘটনাটির বেশ কয়েক বছর পরের কাহিনী।
এরমধ্যেই কেটে গেছে অনেক দিন। নানা রকম চড়াই উৎরাই পেরিয়ে মেয়েটি সমাজে একটা স্থান করতে পেরেছে। অনেক কিছু দেখতে দেখতে মেয়েটা মানসিকভাবে আজ অনেক পরিণত। সবকিছুর সাথে লড়াই করে,রণে ভঙ্গ না দিতে শিখে গিয়েছে। ডিভোর্স এর ধাক্কা সামলে নিয়ে,স্বামী নামক জানোয়ারের পেটানোর সব স্মৃতিকে একপাশে সরিয়ে রেখে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে হারিয়েছে নানা-নানুকে।নতুন চাকরি শুরু করেছে।
এই পর্যন্ত যারা পড়েছেন,পুরুষ কিংবা মহিলা সবাই হয়তো ভাবছেন,”নিশ্চয়ই মেয়েটির চলাফেরায় কোন সমস্যা ছিলো। ইশারা না দিলে কি আর সবাই শুধু ওকেই ত্যক্ত করবে নাকি?আজকালকার যে অবস্থা,কাপড় চোপড়ের বালাই নেই,গায়ের উপর ঢলে ঢলে কথা বলবে,গায়ে গা ঘেঁষে চলবে,আর দোষ দিবে ছেলেদের!! হুহ!!! যত্তসব ন্যাকামি।” সত্যি বলছি কিনা??? স্বাভাবিক। আমাদের চিন্তা যে এতটুকুই প্রসারিত!!!
যাই হোক, মেয়েটা আর দশটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের মতই। সে কিন্তু শর্ট স্কার্ট বা টাইট জামা পড়ে হাঁটেনি।ক্লাস সিক্সে থাকতেই বাবার কথায় সালওয়ার কামিজ পরে চলছে। তাতে কি? শালীন কাপড় পরলেও যা,না পরলেও তা। সাদাসিধে চলা আর পড়াশুনা পাগল একটা মেয়ে।যে কিনা এসবকিছুকে প্রতিবন্ধকতা ভাবেনি।এগিয়ে গেছে সবকিছু পেছনে ফেলে।
যাই হোক, এতো বছর পরে মেয়েটা শুধু জেনেছে পৃথিবীটা অনেক বড় কিন্তু আল্লাহর বিচারে সবকিছুই সমান।
তো যেটা বলছিলাম, ২০১৭ সালের এক সন্ধ্যায় মেয়েটি কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরেছে কেবল।ক্লান্তিতে ভেঙ্গে পড়ে শুয়ে আছে,এমন সময় তার ভাইবারে অপরিচিত এক নাম্বার থেকে আসলো একটা মেসেজ, “হাই”। মেয়েটা যখন জানতে চাইলো কে,তখনই আসতে শুরু করলো বহু বছর আগে ফেসবুকে আসা সেই ছবিগুলো। সোজা হয়ে বসলো মেয়েটি। ঘুমের রেশ কেটে গেছে ততক্ষণে। অবাক বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকলো মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে। তারপর আসতে থাকলো অশ্লীল সব মেসেজ,কিছু threat,আর কিছু নোংরা প্রস্তাব। মেয়েটি প্রথমে স্তম্ভিত হলেও নিজেকে সামলে নিলো। পুলিশের সাহায্য নিল এক বন্ধুর পরামর্শমতো। সেই মোবাইল নাম্বার trace করে পুলিশ বের করলো সেই কালপ্রিট কে। সেইইইই ভাই নামের অমানুষ!!!!! যখন শয়তানটা দেখলো তার মুখোশ আবারও খসে পড়েছে,অন্যের সাহায্য নিয়ে মাফ চাইতে শুরু করলো। আবার সেই পারিবারিক কান্নার আর নাটকের কারনে পারিবারিকভাবেই বিচার(!!!! আদতে বিচারের নামে প্রহসন!!!!) হলো, মুচলেকা নেওয়া হলো।ছেলেটার যেসব ভাইবোনরা প্রথমে জানতেন না তাদের কাজিনের কুকর্ম, ততক্ষন পর্যন্ত মেয়েটিকে ফেসবুকে সমবেদনা জানাচ্ছিলেন। আর যেই মূহুর্তে জানলেন পরিচয়,শেষ। সব সহানুভূতি একপাশে সরিয়ে শুরু হলো ছেলেটার হয়ে ক্ষমা চাওয়া।
।।।।।।।।।
।।।।।।।।।
মাস পেরুতেই মেয়েটা দেখলো সেই সব তথাকথিত ভাইবোনের সেই ছেলেটাকে সাথে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার ছবি। সেই ভাইটা এখন বেশ ভালোই আছে। এমবিএ কমপ্লিট করে ব্যাংকে চাকরি করে। ভদ্রতার মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ায় দিব্যি।
……….
……….
কাহিনী মোটামুটি এটুকুই নীহার।
বলবেন,সহ্য করার গল্পই তো শুধু।
হ্যাঁ, সহ্য করার গল্প হলেও এখানে একটু ব্যতিক্রম এটুকুই যে হার না মানা। সহ্য করে নিজেকে গুটিয়ে না নেয়া। অনেক কিছুই আমাদের হাতে থাকেনা।আমরা অসহায় হয়ে যাই। কিন্তু সেই মূহুর্তে আমরা যেন কোন খারাপ পদক্ষেপ যেমন আত্মহত্যা করে নিজেকে শেষ করে না দেই,মাথা উঁচু করে যেন দাঁড়িয়ে থাকি।
নীহা সবকিছুর বিচার ছেড়ে দিয়েছে আল্লাহর কাছে।
এই গল্পের অনেককিছু আপনার আমার অনেকের জীবনেই কোন না কোন সময় ঘটেছে।
মানুষে ঘেরা এই সমাজে নারীরা যতই #me_too আর নারী অধিকারের দোহাই তুলুক না কেন,দিন শেষে সেও জানে,আমরা চুপ করে থাকি ঠিকই সামনে কিছু ঘটতে দেখলেও,কিংবা কটুক্তি করি আরেকজন নারীকে নিয়েই।
এতে মর্যাদা কার বাড়ে?কারোই তো না।
তাই এখনও সময় আছে।
sympathy নয়, empathy কে কাজে লাগানোর।
কারণ ছেলেরা হয়ত জানেনই না,এমন পরিস্থিতির শিকার কখনো হয়তো আপনার মা,বোন বা স্ত্রী হয়েছেন,কিন্তু লজ্জায় লুকিয়ে রেখেছেন,কি জানি আপনারা কি ভেবে বসেন,প্রশ্ন তুলে ফেলেন তার চলাফেরার।
আর মেয়েরা? আমাদের চোখ তো চিরকালই খোলা থাকতেও বন্ধ।সময় এসেছে চোখ খুলে দেখার।অন্য একজন মেয়েকে তার দুঃসময়ে হেনস্তা না করে,অহেতুক ফেসবুকের নারীর উপর অত্যাচারের পোস্টে উহ আহ না করে সত্যিকার অর্থে বুঝতে শিখুন আরেকজন নারীকে সম্মান করার অর্থ।
অপরাধী যেই হোক,তাকে শাস্তি দিন,তাকে পরিত্যাগ করুন।
নিরপরাধের চরিত্রের উপর প্রশ্ন তুলতে যদি আপনাদের বিবেক জাগ্রত না হয়,তবে দয়া করে সরে যান সেই মানুষের কাছ থেকে।কারন দিন শেষে দশজন কালসাপ বন্ধু বা আত্মীয় থাকার চাইতে বোধ করি আত্মীয় বিহীন অবস্থায় থাকাটাই মানুষটার কাছে বেশি কাম্য হবে।
আল্লাহ তায়ালা তো সব দেখছেন,তাইনা? তিনিই যথেষ্ট।
#happy reading. 🙂
#কারো জীবনের সাথে মিলে গেলে সেটা নিছকই কাকতালীয় নয়।
কারণ এটা যেহেতু আমার জীবনের কাহিনী, আরো দশজন মেয়ের সাথে এর একটি বা অনেকগুলো ঘটনা ঘটা মোটেও কাকতালীয় হতে পারেনা। 🙂
Dr. Nazmun Naher Khan
Swmch 2005-06