নারী হিসেবে আমাদের ভূমিকা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। এই যেমন এক মুহূর্তে স্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে তো পরমুহূর্তেই আবার হয়তো কন্যা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, সাথে সাথেই আবার মা হিসেবেও দায়িত্ব চলে আসে। এর মধ্যে আমরা নারীরা অন্যতম চ্যালেঞ্জ বোধ করি শ্বশুরবাড়িতে নিজেকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এবং চাওয়া পাওয়ার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে। আমরা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দানকারীরা যে ধরনের অসুবিধা নিয়ে কাজ করি তাদের মধ্যে এটি অন্যতম। প্রায়ই দেখা যায় বিয়ে হওয়ার পর পর একটি নতুন পরিবেশে গিয়ে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং সেখানকার ভিন্ন সংস্কৃতি, রীতিনীতি, প্রত্যাশা সব মিলে বেশ বড় রকমের মানসিক চাপ তৈরি হয়। প্রায় সময়ই তা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে নেতিবাচক ভাবে প্রভাবিত করে। জীবনসঙ্গীর থেকে যথেষ্ট পরিমাণ সহযোগিতা এবং পরিবার থেকে সাপোর্ট না পেলে এই পরিস্থিতি আমাদের যথেষ্ট মানসিক পীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেই সাথে নিজের মধ্যকার কিছু গুণাবলি সদ্ব্যবহার করতে পারলে এই পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে নিজেকে শক্তিশালী রাখা যেতে পারে। যেমন:
১. শ্বশুরবাড়ির প্রত্যাশা ও চাওয়াগুলো বুঝতে চেষ্টা করা: প্রথমদিকে দেখা যায় পারষ্পরিক বোঝাপড়ার একটি ঘাটতি থাকে কিংবা প্রত্যাশাগুলো সম্পর্কে বুঝতেই পারা যাচ্ছে না। সেই ক্ষেত্রে খোলামেলা ভাবে আলোচনার চেষ্টা করা যেতে পারে।
২. পার্থক্যগুলো বুঝে সেগুলোর প্রতি সম্মান দেখানো: প্রতিটি পরিবার ভিন্ন ভিন্ন মূল্যবোধের ওপর গড়ে ওঠে। সদস্যদের বেড়ে ওঠা, জীবন অভিজ্ঞতা ও মানসিকতা ভিন্ন হওয়াটিই স্বাভাবিক। এগুলোকে ইতিবাচকভাবে দেখে বুঝতে পারার জন্য চেষ্টা করা এবং যথেষ্ট পরিমাণে সম্মান দেখানো যেতে পারে। এতে সম্পর্কগুলো সুন্দর ছন্দ পায়।
৩. জীবনসঙ্গীর থেকে সহযোগিতা চাওয়া: প্রায়ই দেখা যেতে পারে নিজের জ্ঞান, দক্ষতা এবং মানসিকতা দিয়ে পরিস্থিতি সামলানো যাচ্ছে না। সেই সকল ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে স্বামীর সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে এবং সহযোগিতা চাওয়া যেতে পারে।
৪. স্বামীর দায়িত্ব এবং ভূমিকা সম্পর্কে সচেতনতা: এটি মনে রাখা প্রয়োজন যে স্বামীর ভূমিকাও পরিস্থিতি ভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। তাই তার অবস্থানকে বুঝতে পারা চেষ্টা করা যেতে পারে৷ তার নিজের পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ববোধ এবং স্ত্রী ও স্ত্রীর পরিবারের প্রতি দায়িত্বগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা ও সমর্থন করা গেলে সেটি সম্পর্ককে দৃঢ়তা প্রদান করে।
৫. সীমানা স্থির করা: এই বিষয়টি আমাদের অনেকের কাছেই নতুন বলে মনে হতে পারে। এটিকে সহজ ভাষায় এভাবে বলা যেতে পারে যে নিজের পক্ষে কতটা করণীয় এবং অন্যদের কাছে আমরা কতটা প্রত্যাশা করছি, কোন পরিস্থিতিতে কতটা হস্তক্ষেপ প্রত্যাশিত সেটি সুনির্দিষ্টভাবে বুঝে নেওয়া এবং অন্যদেরও সেটি বুঝিয়ে দেওয়া। এটিকে setting boundary বলেই বোঝানো হয়।
৬. যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি বা Communication Skills বৃদ্ধি করা: সাধারণত দেখা যায় আমরা প্রাকৃতিকভাবে এবং জীবনলব্দ অভিজ্ঞতা থেকে নিজেদের প্রত্যাশাগুলোকে দমিয়ে রাখতে চাই। দীর্ঘদিন এটি করতে করতে একটি সময় গিয়ে তা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে বিস্ফোরিত হয় নিজের মধ্যেই৷ তাই শুরু থেকেই নিজের প্রত্যাশা, চাহিদা এবং অনুভূতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে সেগুলোও যে অন্যদের মতই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তা বিবেচনা ও প্রকাশ করা যেতে পারে। এটিকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘I am Okay, you are okay’ পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হয়।
৭. আত্মপ্রত্যয়ী ও আত্মবিশ্বাসী হওয়া: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় আমরা নিজেকে বেশ ছোট করে দেখি, দূর্বলতাগুলোকেই বেশি গুরুত্ব দিতে থাকি। এতে করে নিজের ভেতরকার স্বত্তাটি আত্মবিশ্বাস হারাতে থাকে। তাই নিজের যে ছোট ছোট ইতিবাচক জায়গাগুলো আছে, দক্ষতা আছে এবং গুণাবলি আছে সেগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তা চর্চা করা প্রয়োজন।
৮. অন্যের বক্তব্যকে নিজের করে না ফেলা: ছোটবেলা থেকেই আমরা বিভিন্ন নেতিবাচক মন্তব্য শুনে বড় হই। ধীরে ধীরে এগুলো আমাদের নিজেদের প্রতি ধারণায় পরিণত হয়৷ সেখান থেকে বিশ্বাসে রূপ নেয়। যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভিত্তিহীন হয়ে থাকে। এ ধরনের চিন্তা বা বিশ্বাসগুলো যাতে নিজেদের মধ্যে স্থান করে না নিতে পারে সেটি সম্পর্কে সচেতন থাকা।
৯. মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করা: যেহেতু নতুন পরিবেশে সবারই কিছু না কিছু মানসিক চাপ হয়ে থাকে তাই এ সময় সহযোগিতা নেওয়া দরকার হয়ে থাকে। পরিবার, বন্ধুবান্ধব, অফিসের সহকর্মী ছাড়াও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারলে নিজেকে মানসিকভাবে ভালো রাখা সম্ভব হয়।
যেহেতু আমরা অন্যকে সরাসরিভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না তাই আমাদের আচরণ, চিন্তা এবং অনুভূতিগুলোকে এরকমভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে যা আমাদের সম্পর্কগুলোকে সহজ করতে সাহায্য করে। এটি করতে গিয়ে নিজেকে বা অন্যকে দূর্বল বা নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করার প্রয়োজন হয় না। তাই নিজের প্রতি সম্মান রেখেই আমরা নিজেদের মানসিকভাবে ভালো রাখতে চেষ্টা করতে পারি। এক্ষেত্রে Women Support Initiative Forum সব সময় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে।