ভিটিলিগো (vit-ih-LIE-go) বা শ্বেতি হল এমন একটি রোগ যার কারণে ত্বকের বর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। বিবর্ণ অঞ্চলটি সাধারণত সময়ের সাথে সাথে বড় হতে থাকে।এই সাদা সাদা দাগ বা ছোপ হওয়া শরীরের যে কোনো অংশের ত্বকের উপর থেকেই শুরু হতে পারে। চুল, ভ্রু এমনকি মুখের ভিতরেও এটা হতে পারে।
শ্বেতি বা ভিটিলিগোর লক্ষণ:
● ত্বকে প্রকাশ পাওয়া যেকোনও সাদা দাগ মানেই কিন্তু তা শ্বেতি নয়।
● তবে শ্বেতির ক্ষেত্রে তা প্রাথমিকভাবে মুখ, বাহু, হাত, শরীরের খোলা জায়গা, যৌনাঙ্গের চারপাশের অঞ্চল এবং নিতম্ব সহ শরীরের যে কোনও জায়গার ত্বকে বিক্ষিপ্ত ছোট ছোট সাদা দাগ হিসেবে দেখা দিতে পারে।
● চোখের মাঝখানে, মাথার চামড়ায়, ভ্রু, এমনকি দাড়িতে পর্যন্ত এটা শুরু হতে পারে। দাড়ি এবং চুল ফ্যাকাশে হয়ে যেতে পারে।
● মুখ এবং নাকের মিউকাস মেমব্রেনে রঙের প্রলেপ উঠে যেতে পারে।
ভিটিলিগোর বা শ্বেতি কারণ:
ভিটিলিগো হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই।নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যেকোনো মানুষের যে কোনো সময়ে এই রোগটি হতে পারে।সাধারণত 30 বছর বয়সের আগে ম্যাকুলস বা প্যাচগুলি স্পষ্ট হয়ে যায়। যদি কোন অটো ইমিউন ডিজিজ বা অ্যাডিসিন রোগে আগে থেকে আক্রান্ত থাকেন তাহলে সেক্ষেত্রে ভিটিলিগো হওয়ার সম্ভবনা বেড়ে যায়।
১. মেলানিন: মানব দেহের ত্বক এবং চুলের রঙ মেলানিন দ্বারা নির্ধারিত হয়। যখন মেলানিন উৎপাদনকারী কোষগুলি মারা যায় বা কাজ করা বন্ধ করে দেয় তখনই চামড়ার উপর ভিটিলিগো বা শ্বেতি দেখা যায়। বেশ কিছু কারনে মেলানিন কমে যায়। যেমনঃ
● অটোইমিউন অবস্থা: এই পরিস্থিতিতে আপনার নিজস্ব ইমিউন সিস্টেম স্ব-মেলানোসাইট কোষগুলোকে বহিরাগত আক্রমণকারী হিসাবে ভুল করে। এর ফলে আপনার শরীরের প্রতিরোধ সৃষ্টি কারী কোষগুলো নিজের দেহের কিছু কোষকে (মেলানোসাইট) শত্রু ভেবে ধ্বংস করার জন্য অ্যান্টিবডি তৈরি করে।ফলে আপনার শরীরে, বিশেষত ত্বকে বিরুপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
● জেনেটিক মিউটেশন: জেনেটিক মিউটেশন হল আপনার শরীরের ডিএনএ এর ভিতরে কিছু রাসায়নিক পরিবর্তন যা আপনার মেলানোসাইটের কাজকে প্রভাবিত করতে পারে।প্রায় 30 টিরও বেশি জিন ভিটিলিগো হওয়ার সাথে যুক্ত আছে বলে মনে করা হয়।
● স্ট্রেস
● পরিবেশগত প্রভাব
২. অন্যান্য:
● বিভিন্ন প্রসাধনীর ব্যবহার
● দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের জুতা
● বেল্ট
শ্বেতী হলে করনীয়:
ভিটিলিগো সব ধরনের ত্বকের মানুষকে প্রভাবিত করে, তবে বাদামী বা কালো ত্বকের লোকেদের মধ্যে এটি আরও স্পষ্ট ভাবে পরিলক্ষিত হয়। এটা অবশ্য জীবননাশক বা সংক্রামক নয়।তবুও এর সাথে জড়িত মানুষের নানা কুসংস্কারের কারণে এই রোগটির একটা সামাজিক প্রভাব আছে যা স্বাভাবিকভাবেই একটা চাপে ফেলে দেয়। যা হতে পারে নিজের সম্পর্কে একটা খারাপ বোধ বা অস্বস্তি ও সংকোচ তৈরি হওয়া।
শ্বেতী মোটেও আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো রোগ নয়। এটি ছোঁয়াচে ভেবে ভয় পাওয়ারও কিছু নেই। এটি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করাতে পারেন। এ রোগের শুরু থেকেই চিকিৎসা নিয়ে পরিচর্যায় থাকলে এটি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে এটি সম্পূর্ণ ভালো হয়ে ওঠা অনেক সময় সাপেক্ষ বিষয়। এ ছাড়া ডায়াবেটিস ও হাইপার থাইরয়েড রোগীদের ক্ষেত্রে শ্বেতী হওয়ার প্রবণতা বেশি হয়ে থাকে।
চিকিৎসা:
শ্বেতী রোগের চিকিৎসা সময়সাপেক্ষ, পুরোপুরি না-ও সারতে পারে। দেহের লোমশ অংশের চিকিৎসা অনেকটাই সফল হয়। কিন্তু যেসব জায়গায় লোম থাকে না, যেমন আঙুল, ঠোঁট ইত্যাদির চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। অনেক সময় নিজে থেকেই সেরে যেতে পারে. তবে সব রোগীর জন্য সব চিকিৎসা পদ্ধতি একরকম ফল দেয় না। রোগীর বয়স, রোগের স্থান এবং ব্যাপ্তিভেদে চিকিৎসা পদ্ধতি বাছাই করা হয়। ডায়াবেটিস, হাইপার থাইরয়েড যাদের রয়েছে, তাদের শ্বেতী হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে।বেশ কিছু উপায়ে ভিটিলিগোর চিকিৎসা করা যায় যেমনঃ
● ওষুধ
● লাইট থেরাপি
● সার্জারি (পাঞ্চ গ্রাফটিং)
● কাউন্সেলিং
প্রতিরোধ:
যেহেতু ভিটিলিগোর বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, এটি প্রতিরোধ করার কোন উপায় নেই। তবে ভিটিলিগো হওয়ার ঝুঁকি কমাতে পারেন। তাই শ্বেতী রোগ এড়াতে সবারই ডায়েট লিস্টে বেশি জোর দেয়ার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
● পর্যাপ্ত পানি পান করা।
● খাবারে (পেঁপে, বাদাম, আদা, তুলসী পাতা, আখরোট, অ্যালোভেরা, হলুদ, অ্যাভোকাডো, তরমুজ, পালং শাক, করলা, বিট, গাজর, মুলা, মাশরুম, কলা, আপেল এবং ভিটামিন এ-সি-ই-ডি সমৃদ্ধ খাবার)।
● নিরাপদ সূর্য এক্সপোজার অভ্যাস অনুশীলন।
● প্রতিদিন একটি ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করে আপনার ত্বকের যত্ন নিন।
● শরীরে চাপ বা আঘাত এড়ানো।
● কোনো অন্তর্নিহিত অটোইমিউন অবস্থার ব্যবস্থাপনা।
শ্বেতী হলে যে খাবারগুলো পরিহার করা উচিত:
১. মদ্যপান করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
২. এ ছাড়া কিছু ফল যেমন — আঙুর, কমলালেবু, বেদানা, পেয়ারা, ব্লুবেরি, গুজবেরি খাওয়া যাবে না।
৩. এ ছাড়া ফলের আচার, কাঁচাটমেটো, কাঁচারসুন, তেঁতুল, মাছ, সামুদ্রিক মাছ, কফি, জাঙ্ক ফুড, চকলেট ইত্যাদি খাবার পরিহার করা উচিত।